হামার কুড়িগ্রাম

ব্রহ্মপুত্রের বালুতে মূল্যবান খনিজ, চিলমারীতে ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিকল্পনা

ব্রহ্মপুত্র নদের বালু থেকে মূল্যবান খনিজ পৃথকীকরণে চিলমারীতে গবেষণা ও পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

চিলমারী প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের বালু থেকে মূল্যবান খনিজ পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের লক্ষ্যে গবেষণা ও পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। বাস্তবায়িত হলে এ উদ্যোগকে ঘিরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় এর অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থার বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজ নিয়ে গবেষণা ও সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে চিলমারীতে ১৫ একর জমিতে পাইলট প্ল্যান্ট এবং কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত ১১ জুন জিএসবির মোখলেসুর রহমান মিলনায়তনে প্রস্তাবিত কেন্দ্র নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। নদীবাহিত বালু থেকে খনিজ পৃথকীকরণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং এ খাতকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

যেসব মূল্যবান খনিজ পাওয়ার সম্ভাবনা

প্রস্তাবিত গবেষণা কার্যক্রমে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, গারনেট, মোনাজাইট ও কোয়ার্টজের মতো খনিজ পৃথকীকরণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব খনিজ রং, সিরামিক, টাইলস, ধাতব পণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি বিরল মৃত্তিকা মৌল নিয়ে গবেষণা এবং জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খনিজভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে খনিজের পরিমাণ, উত্তোলনযোগ্যতা, পরিবেশগত প্রভাব ও বাণিজ্যিক লাভের বিষয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা প্রয়োজন।

প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে মতবিরোধ

প্রকল্পটি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। গত ১৯ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সভার কার্যবিবরণীর ১০ নম্বর আলোচ্য বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে।

তবে কুড়িগ্রামের বর্তমান জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ এ ধরনের প্রতিবেদন তাঁর দপ্তর থেকে পাঠানোর কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাঁর যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ১৯ জুলাইয়ের সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা নেতিবাচক অভিমতের বিষয়ে তাঁর দপ্তর থেকে কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি।

কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় মূল্যবান ও বিরল খনিজ সম্পদ থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় জিএসবি প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে। জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

জিএসবির উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, হিমালয় থেকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীপথে বিপুল পরিমাণ বালু আসে। এসব বালু থেকে ভারী ও হালকা খনিজ পৃথক করা গেলে মূল্যবান খনিজ পাওয়া সম্ভব। এ লক্ষ্যেই গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় খনিজের সম্ভাবনা, প্রয়োজন বাণিজ্যিক মূল্যায়ন

ইনস্টিটিউট অব মাইনিং, মিনারেলজি অ্যান্ড মেটালার্জির (আইএমএমএম) গবেষণার বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের বালুতে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, ম্যাগনেটাইট, গারনেট ও কোয়ার্টজের মতো ছয়টি খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় থাকা এসব খনিজের সম্ভাব্য মূল্য টেকনো-ইকোনমিক মূল্যায়ন ছাড়াই অন্তত ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। তবে এ হিসাবকে সম্ভাব্য মূল্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রকৃত মজুত, খনিজের ঘনত্ব, উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয়, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং বাজারমূল্য নির্ধারণের পরই বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

গাইবান্ধায়ও চলছে খনিজ বালু অনুসন্ধান

ব্রহ্মপুত্রের চিলমারীর ভাটিতে গাইবান্ধার কামারজানি, বালাশী ও মোল্লারচর এলাকায় খনিজ বালু অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি এভারলাস্ট মিনারেলস লিমিটেড। সরকারি নথি অনুযায়ী, এসব এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির তিনটি ব্লকের খনি ইজারা রয়েছে।

কোম্পানিটি খনিজ বালু অনুসন্ধান, নমুনা পরীক্ষা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগী খনিজ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। তবে গাইবান্ধায় কোম্পানিটির কার্যক্রমের সঙ্গে চিলমারীর প্রস্তাবিত সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের কোনো চুক্তি বা যৌথ উদ্যোগ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি স্থানীয়দের

জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই এর লাভ-ক্ষতি নিয়ে নেতিবাচক অভিমত দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্ন তৈরি করেছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। প্রকল্পটি নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে তা নিরসনের আশ্বাস দেন তিনি।

সব মিলিয়ে, ব্রহ্মপুত্রের বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজের সম্ভাবনা কুড়িগ্রামের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, পরিবেশগত প্রভাব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল সম্পর্কে স্বচ্ছ মূল্যায়ন জরুরি।

কুড়িগ্রামের সর্বশেষ খবর

Exit mobile version