নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় মাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর পালিয়ে যান ছেলে মুত্তাকিন আলম শোভন (৩৪)। তবে শেষ রক্ষা হয়নি তাঁর। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া খবর ও ছবি দেখে অভিযুক্তকে শনাক্ত করে অনুসরণ করেন স্থানীয় তিন তরুণ। পরে তাঁর পালানোর চেষ্টা ঠেকিয়ে পুলিশে খবর দেন তাঁরা। একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শোভনকে আটক করে। গতকাল বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের হরিকেশ বাউদিয়াছড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া তিন তরুণ হলেন—আউয়াল ইসলাম জিহাদ, হাসিবুর রহমান হাসিব ও মো. জনি ইসলাম। তাঁদের বাড়ি উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের খলিফার মোড় এলাকায়। তাঁদের এই উদ্যোগে ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তকে আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
এর আগে বুধবার ভোর ৬টার দিকে উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের পলাশবাড়ি এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন পারুল বেগম। তিনি ওই এলাকার সরদার আলীর স্ত্রী। স্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে ছেলের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন সরদার আলী। তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পারুল বেগমকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ফেসবুকে খবর দেখে অভিযুক্তকে শনাক্ত
তিন তরুণের একজন মো. জনি ইসলাম কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা মো. ইদ্রিস আলী পেশায় স্বর্ণকার। আউয়াল ইসলাম জিহাদ হলোখানা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি এবং ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী। অপর তরুণ হাসিবুর রহমান হাসিবের বাবা বজলুর রহমান।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে মো. জনি ইসলাম বলেন, সকালে তাঁরা ঘুরতে বের হয়ে হলোখানার ভাইরাল রাস্তা এলাকায় ছিলেন। এ সময় ফেসবুকে ‘হামার কুড়িগ্রাম’ পেজে ছেলের হাতে মা খুনের খবর ও অভিযুক্তের ছবি দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর কাছাকাছি এক ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তাঁরা তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করেন।
জনি ইসলাম বলেন, “আমরা আগে কিছু জানতাম না। ফেসবুকে খবরটি দেখার পর সামনে একজনকে দেখতে পাই। পরে তাঁকে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করি। আমরা প্রথমে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিই। সেখান থেকে কুড়িগ্রাম সদর থানার এক কর্মকর্তার নম্বর দেওয়া হলে তাঁকে ফোন করি। পুলিশ দ্রুত আসার কথা জানায়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা লোকটিকে অনুসরণ করছিলাম। একপর্যায়ে তিনি একটি ছোট শিশুর সাইকেলে চড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে আমরা রিকশা নিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করি এবং সাইকেলটিও ফিরিয়ে নিই। এরপর অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে আটকে রাখার চেষ্টা করি, যাতে পালাতে না পারেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে তাঁকে আটক করে। এ সময় তাঁর পোশাকের ভেতর থেকে একটি বড় ছুরি উদ্ধার করা হয়।”
মাদকাসক্তির চিকিৎসা চলছিল বলে জানিয়েছে পরিবার
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শোভন দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিরাজগঞ্জের একটি মাদকাসক্তি পরামর্শ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। আড়াই মাস আগে তাঁকে বাড়িতে আনা হয়। প্রথম দিকে ভালো থাকলেও কিছুদিন পর আবারও তাঁর অস্বাভাবিক ও আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু হয়। এ কারণে তাঁকে পুনরায় ওই কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য যোগাযোগ করা হয়।
ঘটনার দিন ভোর ৪টার দিকে পুনর্বাসন কেন্দ্রের লোকজন শোভনকে নিতে বাড়িতে আসেন। তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। এ সময় মা পারুল বেগম তাঁকে শান্ত করতে গেলে শোভন ছুরি দিয়ে মায়ের বুকে উপর্যুপরি আঘাত করেন। স্ত্রীকে বাঁচাতে সরদার আলী ছেলেকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে শোভন তাঁকেও ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তিনি পালিয়ে যান।
এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মোত্তালিব বলেন, শোভনের আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে তাঁর বড় ভাই আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এলাকার লোকজনও আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। মায়ের সঙ্গে ছেলে এমন আচরণ করবে, তা তাঁরা ভাবতেও পারেননি।






