কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিসহ ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারার আওতায় তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে ‘কারেন্ট আনোয়ার’ নামে পরিচিত মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন চলতি বছরের ২৪ মার্চ মারা যান। ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়, ভোর ৬টার দিকে ঢাকায় স্ট্রোক করে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে তাঁর পরিবার শুরু থেকেই মৃত্যুটিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়নি।
মৃত্যুর প্রায় সাত মাস পর নিহতের ভাই মো. মিষ্টার আলী বাদী হয়ে আদালতে একটি সিআর মামলা করেন। সিআইডির নথিপত্র অনুযায়ী, ঢাকার মোহাম্মদপুর আমলী আদালতে দায়ের করা মামলাটি গত ১০ আগস্ট দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় নথিভুক্ত হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডি ঢাকা মেট্রো-পশ্চিম বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক সিকদার মহিদুল আলম স্বাক্ষরিত তলব নোটিশে বলা হয়েছে, মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বিবাদীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
নোটিশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণসহ তাদের হাজির হতে বলা হয়েছে।
### যাদের তলব করা হয়েছে
সিআইডির নোটিশ অনুযায়ী, মামলায় অভিযুক্ত ১০ জনের সবার বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার ঢুষমারা থানা এলাকায়। স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানসহ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা রয়েছেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে যাদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানা গেছে, তারা হলেন—মো. শাহ আলম, ভারপ্রাপ্ত মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও এনসিপি নেতা; শহিদ (শহিদুল) ও মিজান, যুবদল নেতা; আরিফুল কবির তালুকদার রানা, জামায়াত নেতা; নাফিউল আজম জুয়েল, ছাত্রদল নেতা; মো. ইসমাইল হোসেন বাবুল, স্থানীয় ইউপি সদস্য; ওয়ার্ড বিএনপি নেতা শামীম এবং যুবলীগ নেতা দুলাল।
এ ছাড়া নোটিশপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন মো. বদিউজ্জামান বদি, মাজহারুল ও সেলিম।
### রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায়
নিহত আনোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এলাকায় বিভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে। জানা যায়, তিনি জাতীয় পার্টির ‘সাইকেল’ প্রতীকে নির্বাচন করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
তবে স্থানীয় রাজনীতিতে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুর আগে স্থানীয় রাজনীতিতে জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাঁকে বয়কটের আহ্বান এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করার বিষয়েও বিভিন্ন পোস্ট প্রচারিত হয়েছিল।
তবে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু যদি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—তদন্তে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
প্রাথমিকভাবে আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে প্রচার করা হলেও, পরবর্তীতে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের এবং সিআইডির তদন্তে নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এখন সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মামলায় আনা অভিযোগের সত্যতা কীভাবে উঠে আসে, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।






