এনামুল হক সরকার, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উৎসবকে ঘিরে মন্দিরে মন্দিরে চলছে নানা প্রস্তুতি। পূজার ঘটসংকল্প, প্রসাদ ও নাড়ু তৈরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নারিকেলের ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে দুর্গাপূজা সামনে রেখে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বাজারগুলোতে বেড়েছে নারিকেলের চাহিদা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নারিকেল গাছ ছিল। তবে বর্তমানে অনেক বাড়িতে নারিকেল গাছ নেই। কোথাও গাছ থাকলেও ফলন প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে পূজার প্রয়োজন মেটাতে বাজার থেকে নারিকেল কিনতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নারিকেল আমদানি করা না হলে বাড়তি দাম দিয়েও চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতো বলে মনে করেন ক্রেতারা।
রাজারহাট বাজারে ভ্যানগাড়িতে নারিকেল বিক্রি করেন সনজিত কুন্ডু। ছিনাই ইউনিয়নের ছিনাই গ্রামের বাসিন্দা ও স্বর্গীয় ফেলু কুন্ডুর সন্তান সনজিত জানান, গত আট বছর ধরে তিনি ভ্যানগাড়িতে করে গ্রামগঞ্জে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা ও আমড়াসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন। দুর্গাপূজা সামনে রেখে এবার চালানি নারিকেল কিনে বিক্রি করছেন তিনি।
সনজিত কুন্ডু বলেন, পূজা উপলক্ষে নারিকেলের চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে আকারভেদে এক জোড়া নারিকেল ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি। বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম কিছুটা বেশি। আগে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় নারিকেল কিনে কম দামে বিক্রি করতেন। এখন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় এক জোড়া কিনতে হচ্ছে। বিক্রি করছেন ১৬০ থেকে ১৭৫ টাকার মধ্যে।
ক্রেতা দশরত চন্দ্র বর্মন জানান, পূজায় নারিকেলের বিকল্প নেই। তিনি এক জোড়া নারিকেল ২৪০ টাকায় কিনেছেন। তাঁর ছেলে রাজশাহী থেকে ১০ জোড়া নারিকেল কিনেছেন বলেও জানান তিনি।
লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী অমেন চন্দ্র রায়ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে নারিকেল কিনতে রাজারহাট বাজারে এসেছেন। তিনি বলেন, পূজায় আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসবেন। তাঁদের নাড়ু খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া পূজার বিভিন্ন কাজে নারিকেল প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে পূজা উপলক্ষে তাঁর ১০ থেকে ১৫ জোড়া নারিকেল লাগবে।
রাজারহাট ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নারিকেল আমদানিকারক মনিরুজ্জামান বুলু জানান, নোয়াখালী, খুলনা ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তাঁরা নারিকেল সংগ্রহ করেন। এবার ২০০ টাকা দরে ৫ হাজার পিস নারিকেল কিনে ট্রাকে করে রাজারহাটে এনেছেন। সেগুলো ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। ছোট আকারের নারিকেল বিক্রি করছেন জোড়া ২০০ টাকায়। গত বছরও দুর্গাপূজা উপলক্ষে নারিকেল আমদানি করেছিলেন তিনি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার আড়তে দাম বেশি।
রাজারহাট মধ্যবাজারের নারিকেল ব্যবসায়ী শ্রী অশোক চন্দ্র জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিনি রংপুর থেকে ১২০টি নারিকেল প্রতিটি ৯০ থেকে ৯৫ টাকা দরে কিনে এনেছেন। বর্তমানে খুচরা বাজারে বড় আকারের এক জোড়া নারিকেল সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা, মাঝারি আকারের জোড়া ২২০ টাকা এবং ছোট আকারের জোড়া ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় দুর্গাপূজায় নারিকেলের চাহিদা অনেক বেশি থাকে।
এদিকে নারিকেলের চাহিদা পূরণে বাড়ির আশপাশে নারিকেল গাছ রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন রাজারহাট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. মায়দুল হাসান। তিনি বলেন, পরিবারের নিজস্ব চাহিদা মেটাতে প্রতিটি বাড়িতে অন্তত একটি নারিকেল গাছ লাগানো উচিত। তবে ভালো ফলন পেতে গাছের নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি কর্মকর্তা জানান, একটি নারিকেল গাছে বছরে দুই দফায় সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। প্রতি গাছে বছরে ২৫ থেকে ৩০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার, ১ কেজি ইউরিয়া, ৬০০ গ্রাম টিএসপি, ১ কেজি এমওপি, ৫০০ গ্রাম জিপসাম, ৫০ গ্রাম জিংক সালফেট ও ৫০ গ্রাম বোরিক অ্যাসিড প্রয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। প্রথম দফায় এপ্রিল থেকে মে মাসে বার্ষিক সারের অর্ধেক এবং দ্বিতীয় দফায় সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে বাকি অর্ধেক সার প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চারা রোপণের পর জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সার প্রয়োগের জন্য গাছের গোড়া থেকে এক থেকে দেড় মিটার দূরে ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার গভীর করে গোলাকার নালা তৈরি করতে হবে। এরপর গোবর ও রাসায়নিক সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নালায় ছড়িয়ে দিয়ে তা মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মাটিতে রসের ঘাটতি থাকলে সেচ দিতে হবে। নারিকেল গাছের পাতার নিচে কালো দাগ দেখা দিলে ছত্রাকনাশক এবং সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগসহ নিবিড় পরিচর্যা করতে হবে। এতে নারিকেলের ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে দুর্গাপূজার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রসাদ তৈরিতে নারিকেলের অপরিহার্যতা ঘিরে রাজারহাটের বাজারে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাহিদা। স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে পূজার মৌসুমে নারিকেলের সংকট ও বাড়তি দামের চাপ কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






