নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও সংযুক্ত শিক্ষণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। জেলার বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয়ভাবে চিকিৎসক তৈরির সুযোগ সম্প্রসারণে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মোঃ মাহবুবুল আলম এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর কাছে জানতে চান।
প্রশ্নে তিনি বলেন, কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি বৃহৎ ও জনবহুল জেলা। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসাসেবা ও উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতার কারণে জেলার মানুষ নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য অনেক রোগীকেই দূরবর্তী জেলা কিংবা রাজধানী ঢাকায় যেতে হয়। এতে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি সময়, অর্থ ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
তিনি জানতে চান, উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, দক্ষ চিকিৎসক তৈরির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কুড়িগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী জেলার জনগণের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে কুড়িগ্রামে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও সংযুক্ত শিক্ষণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না। পরিকল্পনা থাকলে তার বিস্তারিত কী এবং না থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না।
জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং চিকিৎসা ও নার্সিং শিক্ষার সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও গুণগত মানোন্নয়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে চিকিৎসা ও নার্সিং শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নতুন চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে হাসপাতালভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে সমন্বিতভাবে সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন কোনো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত শয্যাবিশিষ্ট শিক্ষণ হাসপাতাল, বিশেষায়িত বিভাগ, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার বিবেচনায় কুড়িগ্রাম উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দূরত্ব একটি বড় বাধা। বিশেষ করে জটিল রোগ, অস্ত্রোপচার, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীদের অন্য জেলা বা রাজধানীমুখী হতে হয়।
এ অবস্থায় কুড়িগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও সংযুক্ত শিক্ষণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু জেলার মানুষই নয়, আশপাশের জেলার জনগোষ্ঠীও এর সুফল পেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ও উত্তরাঞ্চলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ বাড়বে। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি মোকাবিলাতেও প্রতিষ্ঠানটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অঞ্চলে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রভাব শুধু চিকিৎসা শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেবা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, আবাসন, পরিবহনসহ বিভিন্ন সহায়ক স্বাস্থ্য অবকাঠামোরও বিকাশ ঘটে। ফলে একটি মেডিকেল কলেজ একটি জেলার সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কুড়িগ্রামে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে এর সঙ্গে একটি কার্যকর ও পর্যাপ্ত সক্ষমতার শিক্ষণ হাসপাতাল গড়ে তোলা। কারণ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক রোগী, বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকা জরুরি।
একটি আধুনিক শিক্ষণ হাসপাতালে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস, শিশু, অর্থোপেডিকস, অ্যানেসথেসিয়া, কার্ডিওলজি, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, ইউরোলজি, আইসিইউ ও জরুরি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলা গেলে কুড়িগ্রামের মানুষ নিজ জেলাতেই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেতে পারেন।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের উত্তরাঞ্চলে চিকিৎসা অবকাঠামো ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের দাবি রয়েছে। ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে মেডিকেল শিক্ষা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কুড়িগ্রামে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। পাশাপাশি রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ ও বিকল্প আরও বাড়বে।
সংসদে মন্ত্রীর বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষার সম্প্রসারণকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে কুড়িগ্রামে মেডিকেল কলেজ ও সংযুক্ত শিক্ষণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন, সম্ভাব্যতা যাচাই, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মতো বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়া।
কুড়িগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, সরকারের স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় জেলার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও আধুনিক শিক্ষণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে একদিকে যেমন চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে কুড়িগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দূরত্ব, সময় ও ব্যয়ের চাপ কমবে।
সব মিলিয়ে, সংসদে উত্থাপিত এ প্রশ্ন কুড়িগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটকে সামনে এনেছে। সরকারের স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্প্রসারণের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে কুড়িগ্রামে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ যুক্ত হলে তা শুধু জেলার চিকিৎসাসেবায় নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।






