নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram
কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত ফুটবল মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন মিম। সেই স্বপ্ন এখন তাকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল দলের হয়ে জর্ডানের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন কুড়িগ্রামের এই তরুণ ফুটবলার। দেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অপেক্ষায় এখন তার চোখ-মুখে নতুন প্রত্যয়।
আসন্ন এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ নারী এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ দল জর্ডান সফরে গেছে। আম্মানে স্বাগতিক জর্ডান অনূর্ধ্ব-১৭ নারী দলের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশের মেয়েরা। ম্যাচ দুটি অনুষ্ঠিত হবে ১০ ও ১৩ সেপ্টেম্বর। জর্ডান ফুটবল ফেডারেশনও এরই মধ্যে ম্যাচ দুটির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
জাতীয় দলের এই সফরে কুড়িগ্রামের মিমের অন্তর্ভুক্তি জেলার ফুটবল অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কুড়িগ্রামে মেয়েদের ফুটবল চর্চা অব্যাহত রয়েছে। সেই চর্চা থেকে উঠে এসে মিমের মতো একজন খেলোয়াড়ের জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে জায়গা করে নেওয়া স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিমের এই পথচলায় পরিবার, স্থানীয় কোচ, সংগঠক ও বিভিন্ন পর্যায়ের ফুটবলসংশ্লিষ্ট মানুষের সহযোগিতা ছিল বলে জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের ফুটবল সংগঠক জালাল হোসেন লাইজু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, মিমের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার নিজের দৃঢ় মনোবল, নিয়মিত অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের আস্থা।
লাইজুর ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে মিমের ফুটবল খেলার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই হাস্যকর মনে হয়েছিল। কিন্তু নিজের ইচ্ছাশক্তি ও কয়েকজন মানুষের অনুপ্রেরণায় সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। লালমনিরহাট, রংপুর, চিলমারীসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটবলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাও তার পথচলায় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ঢাকার লিগে এফসি বাড্ডার হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়াকে তার পেশাদার ফুটবলে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
মিমের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লাইজু। তার ভাষায়, একসময় যে মেয়েটিকে নিয়ে কঠোর অনুশীলন করানোর চেষ্টা করেছেন, সেই মিমই এখন দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে জর্ডানে গেছে—এটি তার জন্যও আনন্দ ও আবেগের বিষয়।
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৭ নারী দলের এবারের জর্ডান সফর শুধু দুটি প্রীতি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের সামর্থ্য যাচাই এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ। জর্ডানও আগামী ৫ থেকে ১১ অক্টোবর তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠেয় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ নারী এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের গ্রুপে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাজিকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি জর্ডানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।
এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের আগে বাংলাদেশ দলের জন্যও জর্ডান সফরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ খেলে দলের কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা ও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছেন কোচিং স্টাফরা।
এদিকে জর্ডান ফুটবল ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাগতিক দলটি ২৪ জন খেলোয়াড় নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং কোচ লুনা আল-মাসরির অধীনে নিয়মিত কারিগরি ও শারীরিক অনুশীলন করছে। ১০ ও ১৩ সেপ্টেম্বর আম্মানে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি তাদের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রস্তুতির অংশ।
বাংলাদেশ দল ৮ সেপ্টেম্বর জর্ডানের উদ্দেশে রওনা হয়ে ৯ সেপ্টেম্বর আম্মানে পৌঁছেছে। সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে দলটিকে স্বাগত জানানো হয়। প্রথম ম্যাচটি ১০ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয়টি ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কুড়িগ্রামের মাটিতে শুরু হওয়া মিমের ফুটবলযাত্রা এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চের দ্বারপ্রান্তে। একসময় স্থানীয় মাঠে অনুশীলন করা সেই কিশোরী এখন বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিতে জর্ডানের বিপক্ষে মাঠে নামার অপেক্ষায়। তার এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের ফুটবল স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ারও একটি উদাহরণ।






