বৃহস্পতিবার, 5 নভেম্বর 2026info@hamarkurigram.com
হামার কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রাম এগিয়ে গেলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।ভালোর সাথে, আগামীর পথে হামার কুড়িগ্রাম

রাজ্য জ্যোতির ওপর হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সাইনবোর্ড বিরোধ থেকে রাজনৈতিক উত্তেজনা

· প্রকাশ: · আপডেট:
ফেসবুকে শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, কুড়িগ্রাম জেলার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাজ্য জ্যোতির ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, কুড়িগ্রাম জেলা তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। একই ঘটনায় পাল্টা অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কুড়িগ্রাম জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া সেল প্রধান রাশেদুজ্জামান তাওহীদ।

দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, একটি সাইনবোর্ড স্থাপন ও অপসারণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। পরবর্তী সময়ে এনসিপি নিয়ে রাজ্য জ্যোতির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া সমালোচনামূলক পোস্ট এবং উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের জেরে পরিস্থিতি হাতাহাতিতে গড়ায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, কুড়িগ্রাম জেলার দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৪ আগস্ট ২০২৫ রোজ শুক্রবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কুড়িগ্রাম শহরের কলেজ মোড় বিজয়স্তম্ভ এলাকায় রাজ্য জ্যোতির ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে।

সংগঠনটির দাবি, কলেজ মোড়ের বিজয়স্তম্ভ এলাকা থেকে প্রায় ২৫–৩০ জন ব্যক্তি ১০–১২টি মোটরসাইকেলে করে এসে কলেজ মোড়ের সাদেকুল ইসলামের দোকানের সামনে রাজ্য জ্যোতিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। পরে রাস্তার মাঝে প্রকাশ্যে তার ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলা ও শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একজন জুলাই যোদ্ধার ওপর এ ধরনের সংঘবদ্ধ হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কোনো নাগরিকের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।

সংগঠনটির আরও দাবি, হামলার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের অতীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছে তারা।

 

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে রাজ্য জ্যোতি দাবি করেন, কলেজ মোড়ে কী ঘটেছে এবং কারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে এসেছিল, তা স্থানীয় দোকানদারসহ উপস্থিত অনেকেই দেখেছেন। তার দাবি, সাদেকুল ইসলামের দোকানে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যও ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন।

রাজ্য জ্যোতির অভিযোগ, এনসিপি নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করার কারণে যুবশক্তির সেক্রেটারি তমাল তাকে লোকজন নিয়ে মারতে এসেছিলেন। একই সঙ্গে এনসিপির নেতা রাশেদুজ্জামান তাওহীদ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা পোস্ট করে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নিজের বক্তব্যে রাজ্য জ্যোতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা এবং আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল এবং তার বাসায় হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।

 

অন্যদিকে এনসিপি কুড়িগ্রাম জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া সেল প্রধান রাশেদুজ্জামান তাওহীদ পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, কলেজ মোড়স্থ নিরিবিলি হোটেলের পেছনে সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন বা সংগঠনের নামে সরকারি খাস জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপন করে দখলের চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে ওই সাইনবোর্ড কে বা কারা অপসারণ করে।

তাওহীদের দাবি, ওই ঘটনা নিয়ে রাজ্য জ্যোতি তাকে ফোন করে সাক্ষাৎ করতে বলেন। নির্ধারিত সময়ে সাক্ষাৎ করতে গেলে ১২–১৫ জন ব্যক্তি লাঠিসোটা ও হকিস্টিক নিয়ে এসে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং মারমুখী আচরণ করেন। সাইনবোর্ড হারানোর জন্য তাকে দায়ী করে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় এবং তাকে ও সেখানে থাকা আরও দুই এনসিপি নেতাকে লাঞ্ছিত করা হয় বলে দাবি তার।

তাওহীদের ভাষ্য, এ সময় ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির কয়েকজন সদস্য তাকে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় তাদের কয়েকজনও আহত হন বলে তিনি দাবি করেন। অতীতে সরকারি লাইব্রেরি দখল নিয়ে রাজ্য জ্যোতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে তৈরি হওয়া পূর্ববিরোধের কারণে পরিকল্পিতভাবে ওই ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

জাতীয় যুবশক্তি, কুড়িগ্রাম জেলার সেক্রেটারির দাবি, জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া সেল প্রধান রাশেদুজ্জামান তাওহীদকে ফোন করে কলেজ মোড়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে জিম্মি করে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গেলে রাজ্য জ্যোতির সঙ্গে থাকা ১০–১৫ জন ব্যক্তি হকিস্টিকসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।

 

ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৩ আগস্ট ২০২৫ রোজ বৃহস্পতিবার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের পাশে একটি জায়গায় বামপন্থী সংগঠনগুলোর ২০–২৫ জন তরুণ-তরুণী একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জায়গাটি দখলের উদ্দেশ্যে সাইনবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছিল।

পরে এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক (মিডিয়া) রাশেদুজ্জামান তাওহীদ সাইনবোর্ডটি খুলে ফেলার কথা বলেন। ওই রাতেই অজ্ঞাত ব্যক্তিরা সাইনবোর্ডটি খুলে ফেলেন।

পরদিন সাইনবোর্ড অপসারণের বিষয়টি নিয়ে রাজ্য জ্যোতি, প্রান্তিকসহ কয়েকজন তাওহীদের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং তারা সাইনবোর্ডটি ফেরত চান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসাদুজ্জামান আসাদ তাদের বুঝিয়ে সেখান থেকে পাঠিয়ে দেন বলে জানা গেছে।

এর পরদিন, ১৪ আগস্ট শুক্রবার, কলেজ মোড়ে রাজ্য জ্যোতিসহ কয়েকজনকে পেয়ে যুবশক্তির কয়েকজন সদস্য এনসিপি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় রাজ্য জ্যোতির গায়ে আঘাত লাগে বলে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে যুবশক্তিরই আরেকটি গ্রুপ পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করে বিরোধ থামানোর চেষ্টা করে বলে তাদের ভাষ্য।

 

ঘটনার বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বেশ কিছু বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। কোথায়, কীভাবে এবং কার উদ্যোগে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে—তা নিয়ে রয়েছে পরস্পরবিরোধী দাবি। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, কুড়িগ্রাম জেলা জানিয়েছে, তারা কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক রাজনীতি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। সংগঠনটির দাবি, হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী, ইন্ধনদাতা ও সহযোগীদেরও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

সংগঠনটির আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন বলেন, “অপরাধের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কেউ যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে কোনো অভিযুক্ত যেন আইনের আওতার বাইরে থাকতে না পারে—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

রাজ্য জ্যোতির ওপর হামলার অভিযোগ এবং একই ঘটনায় এনসিপি নেতাদের পাল্টা অভিযোগ—উভয় বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে।

বিজ্ঞাপন

ট্যাগ: · · · · · ·

আরও সংবাদ

সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জুয়েলকে কেন্দ্রের শোকজ

নভেম্বর 4, 2026

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি।   গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিনার স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে জুয়েলের বিরুদ্ধে সংগঠনের নীতিবিরোধী অবস্থান গ্রহণ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত কার্যকলাপে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ […]

নীতিগত বিচ্যুতি ও একনায়কতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এনসিপি নেতা নুরন্নবীর পদত্যাগ

নভেম্বর 1, 2026

নিউজ ডেস্ক | Hamar Kurigram দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আদর্শিক বিচ্যুতি ও একনায়কতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নুরন্নবী সরকার পদত্যাগ করেছেন। দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব সাংগঠনিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। রোববার (১ নভেম্বর) সকালে কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের এ ঘোষণা […]

ফিড-ওষুধ ও বিদ্যুতের বাড়তি দামে চাপে কুড়িগ্রামের পোল্ট্রি খামারিরা

অক্টোবর 31, 2026

হুমায়ূন কবীর সূর্য | Hamar Kurigram ফিড, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কুড়িগ্রামে পোল্ট্রি খামারিরা চরম সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে ডিমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। এতে জেলার পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে বর্তমানে ২৭৫টি […]