নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram
‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’—দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে গুলির সামনে দাঁড়ানো জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ বীর যোদ্ধা আবু সাঈদের আত্মত্যাগের স্মৃতিতে আবেগে ভাসল কুড়িগ্রাম। বক্তারা বলেন, তাঁর বুকের তাজা রক্তেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন গতি পেয়েছিল এবং সেই আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে কুড়িগ্রাম টাউন হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আয়োজনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা স্মৃতি, শোক, প্রতিবাদ ও প্রত্যয়ের এক আবেগঘন মিলনমেলায় পরিণত হয়। শহীদ পরিবারের আহাজারি এবং আহত সম্মুখযোদ্ধাদের বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণে পুরো মিলনায়তনের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আজিজুর রহমান সরকার স্বপনের সভাপতিত্বে এবং ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হামিদ মিয়ার সঞ্চালনায় আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, “জুলাই যুদ্ধের কারণেই আজ মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এগোতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা।”
বিশেষ অতিথি কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার অভিযোগ করেন, বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্য করা হচ্ছে, যা জুলাই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের বক্তব্যে। গাজীপুরে ২০ জুলাই গুলিতে নিহত শহীদ নূর আলমের স্ত্রী মোছা. খাদিজা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার সন্তান যখন ‘বাবা’ বলে ডাকে, তখন আমার কাছে কোনো উত্তর থাকে না।” তিনি ঘটনার বিচার দাবি করেন।
আহত যোদ্ধা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, শরীরে গুলির ক্ষত নিয়ে আজও অসহনীয় যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। নিজের সন্তানকে কোলে নেওয়াও তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অনেক রাতই তাঁকে ব্যথায় নির্ঘুম কাটাতে হয়।
সভায় আরও বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা মো. নিজাম উদ্দিন, জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি শবেবর রহমান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলার সভাপতি লোকমান হাকিম লিমন, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা নূর উদ্দিন কাসেমী এবং আহত যোদ্ধা মো. ইমরান হোসেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আজিজুর রহমান সরকার স্বপন শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বলেন, “শহীদদের রক্তের সঙ্গে যারা বেইমানি করবে, ইতিহাস তাদের কখনো ক্ষমা করবে না।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. রাশেদুল ইসলাম রোমান।
জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ, আহত যোদ্ধাদের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। পুরো আয়োজনজুড়ে বারবার উচ্চারিত হয় একটি বার্তা—আবু সাঈদের বুকের রক্তে লেখা ইতিহাস কখনো মুছে যাবে না।






