নিউজ ডেস্ক অনলাইন
কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বর্তমান চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার নুসরাত সুলতানা সরকারের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেছেন। তাঁর এই সাফল্যে কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের এক অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময়ে, ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর নুসরাত সুলতানা কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় এক বছরের দায়িত্বকালে তিনি জেলার সার্বিক উন্নয়ন, বিশেষ করে চরাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সাহসী, মানবিক ও ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেন।
দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন প্রায় সাড়ে ৮শ’ বর্গকিলোমিটার চরাঞ্চলে প্রায় ৪ শতাধিক চর রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় আড়াই শতাধিক চরে বসবাসকারী প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
এসি কক্ষের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে কখনো ঘোড়ার গাড়িতে, কখনো ভাঙাচোরা মোটরসাইকেলে, আবার কখনো তপ্ত বালুচর পায়ে হেঁটে তিনি চিলমারীর অষ্টমীর চর, নাগেশ্বরীর দুর্গম নারায়ণপুর এবং তিস্তার বিদ্যানন্দ চরের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন।
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ, কুড়িগ্রাম জেলার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, নুসরাত সুলতানার মূল লক্ষ্য ছিল কুড়িগ্রামকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, চরাঞ্চলের উন্নয়ন ছাড়া জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাল্যবিবাহজনিত সামাজিক সংকট নিরসনেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, চরবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে একটি স্বতন্ত্র ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাব সরকারের উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপন করেছিলেন নুসরাত সুলতানা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি দূরদর্শী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু জানান, নুসরাত সুলতানা কুড়িগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে একাধিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
• ধরলা নদীর তীরে ৩০ কোটি টাকার বালু ভরাট প্রকল্প এবং প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দে প্রস্তাবিত ধরলা পার্ক নির্মাণ।
• সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, চিলমারী ও গাইবান্ধা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ সংযোগের মহাপরিকল্পনা।
• কুড়িগ্রাম সদরের ধরলা সেতু সংলগ্ন ভুটানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত চালু এবং সোনাহাট স্থলবন্দর আধুনিকায়নের উদ্যোগ।
• ধরলা নদীর নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিং কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা।
এছাড়াও চরাঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করা, যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং বন্যাকালে চরাঞ্চলের শিশু ও প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে বিভিন্ন টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কুড়িগ্রামে নুসরাত সুলতানার গতিশীল কর্মযজ্ঞ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি প্রশাসনিক টানাপোড়েনের কারণে।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবুর ভাষ্য, জেলা প্রশাসকের কিছু সাহসী পদক্ষেপের ফলে স্থানীয় এক এনজিও নেতার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে এক বছরের মাথায় তাঁকে কুড়িগ্রাম থেকে বদলি করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, নুসরাত সুলতানা ছিলেন সম্পূর্ণ নিরহংকারী, মানবিক ও জনবান্ধব একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর মূল অঙ্গীকার।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, যুগ্ম সচিব পদে তাঁর পদোন্নতিকে কুড়িগ্রামের অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষ নিজেদের গর্ব হিসেবে দেখছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তিনি যেখানেই দায়িত্ব পালন করুন না কেন, কুড়িগ্রাম ও চরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নে তাঁর আন্তরিকতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।






