সোনালী ব্যাংকে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, কুড়িগ্রামে কর্মরত সাবেক ব্যবস্থাপক; পলাতক নৈশপ্রহরী


Hamar Kurigram প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১, ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ন / ০
সোনালী ব্যাংকে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, কুড়িগ্রামে কর্মরত সাবেক ব্যবস্থাপক; পলাতক নৈশপ্রহরী

নিজস্ব প্রতিনিধি ।। হামার কুড়িগ্রাম

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখায় অর্ধশতাধিক গ্রাহকের প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকটির নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়া গত ২০ জুলাই থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। অন্যদিকে, শাখাটির সাবেক ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে কুড়িগ্রামে কর্মরত সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) শরীফ হাসান মুরাদের বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ফিরোজ মিয়ার অনুপস্থিতির পর একাধিক গ্রাহক তাঁদের হিসাবে টাকা না থাকার অভিযোগ নিয়ে শাখায় যোগাযোগ করেন। এ ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পাশাপাশি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভাগীয় তদন্ত চলছে বলে জানানো হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফিরোজ মিয়া নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের ইসমাইল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে ওই শাখায় নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন ব্যাংকে কাজ করার সুবাদে স্থানীয় অনেক গ্রাহকের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, নৈশপ্রহরীর দায়িত্বের বাইরে তিনি নতুন হিসাব খোলা, ঋণের কাগজপত্র প্রস্তুত এবং টাকা জমা-উত্তোলনের মতো কাজেও যুক্ত ছিলেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে ফাঁকা চেক, জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, অলিখিত স্ট্যাম্প ও ছবি সংগ্রহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

গ্রাহক ছাদিকুল মিয়া অভিযোগ করেন, ঋণ পাওয়ার জন্য অনেক গ্রাহককে ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতো। তাঁর মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা হবে—এমন আশ্বাসে অনেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন হলেও গ্রাহকদের হাতে দেওয়া হতো তুলনামূলক কম টাকা। পরে ব্যাংকের নোটিশ পেয়ে ঋণের প্রকৃত পরিমাণ জানতে পেরে অনেকে বিপাকে পড়তেন।

ছাদিকুল মিয়ার দাবি, এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ব্যাংকের অন্য কোনো কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন কি না, তা বেরিয়ে আসবে।

তহুরা বেগম নামে এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, ডিপিএসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর টাকা তুলতে গেলে ফিরোজ মিয়া তাঁর চেকে স্বাক্ষর নিয়ে কয়েক দিন পরে আসতে বলেন। পরে ব্যাংকে গিয়ে তিনি হিসাবে টাকা না থাকার বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি শাখা ব্যবস্থাপককে জানানো হলে টাকা ফেরতের বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

আরজিনা বেগম নামে এক মাদরাসাশিক্ষিকা দাবি করেন, তাঁর বেতন হিসাব থেকে ২৮ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, মোবাইল ফোনে লেনদেনের বার্তা আসা বন্ধ রেখে চেকের মাধ্যমে বেশি টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে।

কলেজশিক্ষক রবিউল ইসলাম অভিযোগ করেন, ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য তিনি ফিরোজ মিয়াকে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বিনিময়ে তাঁকে জমার সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত একটি রসিদ দেওয়া হয়। পরে তিনি সেটিকে ভুয়া বলে বুঝতে পারেন বলে দাবি করেন। তাঁর আরও অভিযোগ, ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের বার্তা পাওয়ার সুবিধা বন্ধ ছিল।

সাবেক ব্যবস্থাপকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

মশিউর রহমান ও রাসেল নামে দুই গ্রাহক অভিযোগ করেন, তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক শরীফ হাসান মুরাদসহ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। তাঁদের দাবি, একজন নৈশপ্রহরীর পক্ষে এককভাবে এত বড় পরিসরে অনিয়ম করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তাঁরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদের বিষয়েও তদন্তের দাবি জানান। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যায়নি।

শরীফ হাসান মুরাদ আগে কিশোরগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন। বর্তমানে তিনি কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) কার্যালয়ে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

টাকা ফেরতের দাবি পরিবারের

অভিযুক্ত ফিরোজ মিয়ার বাবা কছির উদ্দিন বলেন, তাঁর ছেলে কোথায় আছেন, তা তিনি জানেন না। তবে গাড়াগ্রামের তহুরা বেগমসহ কয়েকজনের ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা শাখা ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায়ের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফিরোজ মিয়ার দুলাভাই সফিকুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী গ্রাহকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক ও পুলিশের বক্তব্য

কিশোরগঞ্জ শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বলেন, ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এ মুহূর্তে গ্রাহকের সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ জুলাই থেকে ফিরোজ মিয়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে ঢাকায় জরুরি কাজে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়।

এরপর ১৫ থেকে ২০ জন গ্রাহক ব্যাংকে এসে তাঁদের হিসাবে টাকা না থাকার অভিযোগ জানান। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।

কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল গফুর মিয়া বলেন, সোনালী ব্যাংকের নৈশপ্রহরীর খোঁজ পেতে শাখা ব্যবস্থাপক থানায় একটি মিসিং ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

এ ঘটনায় গ্রাহকদের অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, অর্থ উত্তোলন বা স্থানান্তরের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং টাকা উদ্ধারের বিষয়ে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

কুড়িগ্রামের সর্বশেষ সংবাদ