
প্রফেসর মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন
বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রাথমিক আইনি ভিত্তি হলো The Registration of Private Schools Ordinance, 1962। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে শিক্ষা, ধর্ম, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গঠিত হওয়ার পর থেকে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকি আরও সুসংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে এই অধ্যাদেশ সংশোধন করে Registration of Private Schools (Amendment) Act, 1989 পাস করা হয়। শিক্ষক নিয়োগের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৫ সালে পাস হয় ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন’। এছাড়া ২০০২ সালের আইনের মাধ্যমে গঠিত হয় ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড’, যা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১৯,৭৫৭টি এবং সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে প্রায় ২১,০৮৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬৮ জন শিক্ষক কর্মরত এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৯০ হাজার ২২ জন। এর মধ্যে প্রায় ৯৩.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে।
১৯৬২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালনা কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত ও সময়োপযোগী বলে বিবেচিত হয়েছে। একসময় সভাপতির জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল না। ফলে অশিক্ষিত ও অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে বিদ্যালয় পরিচালনায় নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।
উল্লেখ্য, একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বি.এড/এম.এড সনদপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করেন। এ ধরনের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের সঙ্গে অশিক্ষিত বা নিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন পরিচালনা কমিটির সভাপতির সমন্বয় করে শিক্ষা মানোন্নয়ন করা বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য অনেকেই নানা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতেন। যাদের শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা ছিল না, এমনকি যাদের সন্তানরাও শিক্ষিত নয়—তাদের মধ্যেও কেউ কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে সভাপতি হতেন। আর যারা নির্বাচিত হতে পারতেন না, তারা অনেক সময় বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে দিতেন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করতেন।
এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সভাপতি শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজের ব্যক্তিগত কর্মচারীর মতো আচরণ করতেন। শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি নারী হতেন, তাহলে তার পক্ষে দায়িত্ব পালন আরও কঠিন হয়ে পড়ত।
এ ধরনের ঘটনার বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১,৮০০ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০২টি বিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব, দলাদলি ও মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬টি মামলা বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। নিম্ন আদালতে থাকা মামলার সঠিক পরিসংখ্যানও শিক্ষা বোর্ডের কাছে নেই।
দেশের বিভিন্ন স্থানে কমিটি নিয়ে সংঘর্ষে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও প্রধান শিক্ষককে মারধর করে আহত করা হয়েছে, কোথাও জুতাপেটা করা হয়েছে, আবার কোথাও শিক্ষক-কর্মচারীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে অথবা বেতন-ভাতা বন্ধ রেখে পরে উৎকোচের বিনিময়ে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
যে সময় পরিচালনা কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ছিল, সে সময় নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ, অবৈধ নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ ও ভ্যাট-আইটি সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের কারণে প্রায় ৯০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে এবং প্রায় ১৭৬ একর জমি উদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
এ ধরনের নিয়োগসংক্রান্ত মামলার তদন্তে পুলিশ ও প্রশাসনের বিপুল সময় ব্যয় হয়। একটি জটিল নিয়োগসংক্রান্ত মামলায় প্রাথমিক তদন্ত, নথিপত্র যাচাই, রিপোর্ট তৈরি এবং আদালতে হাজিরা দিতে একজন কর্মকর্তার শতাধিক কর্মঘণ্টা ব্যয় হয়। ফলে শিক্ষা প্রশাসনের মূল্যবান সময়ও অনুৎপাদনশীল কাজে নষ্ট হয়।
একজন প্রধান শিক্ষকের প্রধান পরিচয় একজন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে। কিন্তু যখন তাকে দিনের পর দিন আদালত বা আইনজীবীর চেম্বারে সময় কাটাতে হয়, তখন তার পেশাগত আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। তিনি শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের বদলে নিজের চাকরি রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীরা।
বর্তমানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক বেশি স্বচ্ছ হয়েছে। ফলে মেধাবীরা সুযোগ পাচ্ছেন। এই অবস্থায় আবার নিয়োগ ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হলে সেই পুরোনো সমস্যাগুলো ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অশিক্ষিত ম্যানেজিং কমিটির কারণে শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন, ভুয়া সনদধারীরা নিয়োগ পেয়েছেন এবং শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। তাই সেই পুরোনো ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হবে ‘খাল কেটে কুমির আনার’ মতোই।
আমরা চাই বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক সংস্কার বজায় থাকুক। নীতিনির্ধারকরা যদি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নেন, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও যুগান্তকারী পরিবর্তন সম্ভব।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোসাইকোলজি গবেষক এলিজাবেথ ম্যাটির মতে, ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যখন অন্যদের অনুভূতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, তখন তাদের সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞা আরও বৃদ্ধি পায়। আমরা আশা করি, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতেই থাকবে, যারা জ্ঞান, নৈতিকতা ও শিক্ষার মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন।
তবেই দেশ ও জাতির প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
লেখক:
অধ্যক্ষ (পি.আর.এল)
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।
আপনার মতামত লিখুন :