হামার কুড়িগ্রাম

একই মাঠের এক পাশে নামাজ, অন্য পাশে পূজা—ফুলবাড়ীতে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

বিপুল মিয়া, ফুলবাড়ী

একই মাঠের এক পাশে মসজিদে আদায় হচ্ছে নামাজ, অন্য পাশে চলছে শারদীয় দুর্গাপূজা। আজান ও জিকিরের ধ্বনির পাশাপাশি পূজার সময় ভেসে আসে উলুধ্বনি ও ঢাকের বাদ্য। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা সদরের কাচারী মাঠ।

উপজেলা সদরের এই মাঠে প্রায় ৫০ গজ দূরত্বে অবস্থিত কাচারী মাঠ জামে মসজিদ ও কাচারী মাঠ দুর্গাপূজা কেন্দ্রীয় মন্দির। পাশাপাশি দুই ধর্মীয় উপাসনালয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৫০ বছর ধরে এখানে এভাবেই ধর্মীয় কার্যক্রম চলে আসছে। এ নিয়ে কখনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, দেশভাগের আগে কোচবিহারের মহারাজার আমলে ফুলবাড়ীর চাকলায় দুর্গাপূজার জন্য একটি চালাঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে স্থানটি কাচারী মাঠ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে এখানে উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর স্থানীয় মুসল্লিদের উদ্যোগে একই মাঠে নির্মাণ করা হয় ছোট একটি টিনশেড নামাজঘর। সময়ের ব্যবধানে সেটিই বড় হয়ে বর্তমানে জামে মসজিদে রূপ নিয়েছে।

এবারও কাচারী মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের মধ্যে চলছে প্রসাদ বিতরণ। তবে দুপুরে জোহরের আজান শুরু হলে মন্দিরের ঢাক-ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। মসজিদে নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা, উলুধ্বনি ও ঢাকের বাদ্য। ধর্মীয় আচার পালনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এই চর্চা স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

কাচারী মাঠের পাশের নরসুন্দর পরিমল রায় বলেন, “আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে এখানে দোকান করছি। এই মাঠের মন্দিরে পূজা হচ্ছে, পাশেই মসজিদে নামাজ হচ্ছে। আমরা কখনো কোনো সমস্যা অনুভব করিনি। মুসলিম ভাইয়েরা সবসময় আমাদের সহযোগিতা করেন।”

সংস্কৃতিকর্মী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “কাচারী মাঠে একই সঙ্গে মসজিদ ও মন্দিরের ধর্মীয় কার্যক্রম চলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র ফুটে উঠেছে।”

কাচারী মাঠ জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই কাচারী মাঠ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এক পাশে মসজিদ, অপর পাশে মন্দির। আমাদের নামাজের সময় হলে তাঁরা সহযোগিতা করেন এবং ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন।”

কাচারী মাঠ দুর্গাপূজা কেন্দ্রীয় মন্দির কমিটির সভাপতি বীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, “এটি বহু পুরোনো মন্দির। মুসলিম ভাইয়েরা সবসময় আমাদের সহযোগিতা করেন। কোনোদিন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি অটুট থাকবে।”

স্থানীয়দের মতে, একই মাঠে মসজিদ ও মন্দিরের ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলার এই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি উদাহরণ। ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও পাশাপাশি থেকে নিজ নিজ বিশ্বাস ও আচার পালন করে চলেছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

Exit mobile version