ডেস্ক নিউজ
কাগজে-কলমে সার আছে, বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমন মৌসুমে প্রয়োজনের সময় সার কিনতে গিয়ে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ উঠছে। কোথাও দীর্ঘ লাইন, কোথাও সার না পাওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ ঘিরে তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা।
গত কয়েক দিনে রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী ও রাজীবপুরে সার বিতরণকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনা সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সরকারি বরাদ্দ ও মজুতের হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতার এতটা পার্থক্য কেন?
সরকারি হিসাবে কুড়িগ্রামে বরাদ্দ
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ হাজার ৬৪৪ টন, ডিএপি ১ হাজার ৯২১ টন, টিএসপি ৮০২ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৩২৬ টন।
কৃষকদের অভিযোগের পর অতিরিক্ত ৫০০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে বরাদ্দের পরিমাণ থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনের সময়ে সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—বরাদ্দকৃত সার সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে গিয়ে কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে?
রৌমারীতে গুদাম ঘিরে উত্তেজনা
গত ৭ সেপ্টেম্বর রৌমারীতে সার বিতরণে দেরিকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, ক্ষুব্ধ কৃষকেরা এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যান।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তৎপরতা শুরু হয়। তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাঠপর্যায়ের অসন্তোষের বিষয়টি সামনে আসে।
ভূরুঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ
এর আগে ভূরুঙ্গামারীতেও সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে যেতে হয়।
কৃষকদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তারা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছিলেন না। এ সময় একজন কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়।
রাজীবপুরে ১৬ সেপ্টেম্বর নতুন করে উত্তেজনা
১৬ সেপ্টেম্বর রাজীবপুরে সার বিতরণকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছিলেন না।
পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানা যায়।
এসব ঘটনার ফলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি বরাদ্দ যদি পর্যাপ্ত থাকে, তাহলে ডিলার পর্যায়ে গিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন?
শুধু মজুতের হিসাবেই কি সমস্যার সমাধান?
জাতীয় পর্যায়ের সরকারি হিসাবেও সারের উল্লেখযোগ্য মজুত থাকার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সার মজুত থাকার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ইউনিয়ন বা বিক্রয়কেন্দ্রে একই সময়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পৌঁছে গেছে।
কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—তার এলাকার ডিলারের কাছে কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কত সার গুদামে এসেছে, কতটা বিক্রি হয়েছে এবং কী দামে বিক্রি হয়েছে।
এই তথ্যগুলো যদি এলাকাভিত্তিকভাবে প্রকাশ করা হয়, তাহলে কোথায় সরবরাহ ঘাটতি এবং কোথায় বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা—তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগও আছে
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করছেন কৃষকেরা। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বক্তব্য, বিক্রয় রেজিস্টার ও প্রশাসনের তদন্তের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
কৃষকদের দাবি, সরকারি দামে সার না পেলে বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনতে হয়। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো সার না পাওয়ায় আমন আবাদ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্ন এখন গুদাম থেকে মাঠ পর্যন্ত
সারের সংকট নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাটি হয়তো শুধু ‘সার আছে কি নেই’—এখানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, বরাদ্দকৃত সার গুদাম থেকে কৃষকের হাতে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে কী ঘটছে?
বরাদ্দের পর পরিবহন, ডিলারের গুদামে সংরক্ষণ, বিক্রয় এবং কৃষকের কাছে সরবরাহ—প্রতিটি পর্যায়ের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা গেলে সমস্যার প্রকৃত জায়গাটি শনাক্ত করা সহজ হবে।
কারণ সরকারি নথিতে সার থাকার তথ্য তখনই কৃষকের জন্য অর্থবহ, যখন সেই সার সময়মতো, নির্ধারিত দামে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকের হাতে পৌঁছায়।
আমন মৌসুমে সময়মতো সার না পাওয়া গেলে ক্ষতির প্রভাব শুধু একজন কৃষকের ওপর নয়, সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদন খরচের ওপরও পড়তে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কুড়িগ্রামে বরাদ্দকৃত সার কোথায় যাচ্ছে, কতটা কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে তৈরি হচ্ছে সংকট?
