Site icon হামার কুড়িগ্রাম

শিক্ষার্থী সংকটে মুড়িয়াহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। শিক্ষক-কর্মচারী ১৫–২০ জন, অথচ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী হাতেগোনা; অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অভিযোগ

নাগেশ্বরী প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মুড়িয়াহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় যেন ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীশূন্যতার দিকে এগোচ্ছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন। অথচ এর বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষার্থী সংকট এতটাই প্রকট যে অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কম থাকে। ফলে নিয়মিত পাঠদান কতটা কার্যকরভাবে চলছে এবং শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা পাচ্ছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসএসসি পরীক্ষা?

শিক্ষার্থী সংকটের মধ্যেই বিদ্যালয়টিকে ঘিরে উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, পাশের একটি বেসরকারি/প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মুড়িয়াহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব শিক্ষার্থী নিয়মিত অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলেও এসএসসি পরীক্ষার সময় মুড়িয়াহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নেয়। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি শুধু কোনো একটি বছরের নয়; প্রতিবছরই এমনভাবে শিক্ষার্থী আনার ঘটনা ঘটে।

তবে অভিযোগটির সত্যতা, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং তারা কোন প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষার্থী—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের সন্তানরা কোথায় পড়ছে?

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংকটের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজেদের সন্তানদের বড় একটি অংশ কেন এই বিদ্যালয়ে পড়ছে না?

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর সন্তান নিজেদের কর্মস্থলের বিদ্যালয়ে না পড়ে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। বিষয়টি সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যারা নিজেরাই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, তারাই যদি সন্তানদের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠান বেছে নেন, তাহলে সাধারণ অভিভাবকদের কাছে এই বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা তৈরি হবে কীভাবে?

স্থানীয় অভিভাবকদের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের পাঠদানের মান, শিক্ষার পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্য কোনো কারণে কি শিক্ষক-কর্মচারীরাই নিজেদের সন্তানদের এখানে পড়াতে আগ্রহী নন?

অবশ্য এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের বক্তব্য ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাও জানা প্রয়োজন।

বাড়ির পাশে বিদ্যালয়, তবুও উপজেলা সদরে ছুটছে শিক্ষার্থীরা

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিদ্যালয়ের ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় আশপাশের অনেক শিক্ষার্থী বাড়ির কাছে প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও দূরের বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। এমনকি অনেকে নাগেশ্বরী উপজেলা সদরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয় কেন নিজ এলাকার শিক্ষার্থীদেরই ধরে রাখতে পারছে না?

একদিকে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা দূরের প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংকট পূরণে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এই বিদ্যালয়ের নামে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠছে। এ দুই বিষয়কে ঘিরে বিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

তদন্তের দাবি স্থানীয়দের

স্থানীয়দের মতে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু শিক্ষক-কর্মচারী থাকলেই হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত পাঠদান, পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী উপস্থিতি, মানসম্মত শিক্ষা, শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ এবং অভিভাবকদের আস্থা।

তাই মুড়িয়াহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে শিক্ষার্থী সংখ্যা, উপস্থিতির হার, শ্রেণি কার্যক্রম, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন, শিক্ষক-কর্মচারীদের সন্তানদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অভিযোগ—সবকিছু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের প্রত্যাশা, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রকৃত কারণ বের করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

কারণ, বাড়ির পাশে বিদ্যালয় থাকার পরও যদি এলাকার শিক্ষার্থীরা সেখানে না পড়ে দূরের প্রতিষ্ঠানে চলে যায়, তাহলে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থী সংকট নয়—একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ারও বড় ইঙ্গিত।

এখন প্রশ্ন—মুড়িয়াহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংকটের প্রকৃত কারণ কী? স্থানীয় শিক্ষার্থীরা কেন বিদ্যালয় ছেড়ে দূরে যাচ্ছে? আর অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অভিযোগই বা কতটা সত্য?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিদ্যালয়ের নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে।

Exit mobile version