Site icon হামার কুড়িগ্রাম

রেলের পতিত জমি হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার

সম্পাদকীয় | Hamar Kurigram

বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। রেলের নিজস্ব বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকলেও এর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত কিংবা বেদখল অবস্থায় রয়েছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ৩১ হাজার ৮৬০ একর। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১ হাজার ৪ একর এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩ হাজার ৩৮৭ একর জমি বেদখল হয়ে রয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহৃত রেখে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার এসব জমি উদ্ধার করে সুপরিকল্পিত নীতিমালার আওতায় জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারে।

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশনে অসংখ্য বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, অসহায়, ভিটেমাটিহীন ও ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। বিশেষ করে শীতের রাতে তাদের অনেকের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই হয়ে ওঠে রেলস্টেশন। রেলের পরিত্যক্ত জমিতে যদি ছোট ছোট আবাসন ও পুনর্বাসন প্রকল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে এসব মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি রেললাইনের ধারে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসও অনেকাংশে কমে আসবে।

এসব আবাসন ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের আশপাশের অব্যবহৃত জমিতে সংশ্লিষ্ট স্টেশন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মৌসুমি শাক-সবজি, লাউ, শিম, আলু, পেঁয়াজ, পটল, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য চাষ করা যেতে পারে। উৎপাদিত ফসল পুনর্বাসিত অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হলে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তি, চুরি কিংবা অপরাধপ্রবণতা কমাতেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া রেলের পতিত জমি ভূমিহীন কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষি, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, নার্সারি কিংবা অন্যান্য উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের জন্য লিজ দেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন ভূমিহীন মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে রেলওয়েরও নিয়মিত আয় বৃদ্ধি পাবে। এই আয় রেলের অবকাঠামো উন্নয়ন, যাত্রীসেবা বৃদ্ধি এবং সরকারি রাজস্বের ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশের অধিকাংশ রেলস্টেশনের পাশে রেলের মালিকানাধীন বড় বড় জলাধার রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক অসাধু ব্যক্তি এসব জলাধার ভরাট করে দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। বিশেষ করে গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ ধরনের অনিয়ম প্রকট আকার ধারণ করেছিল। এসব দখল ও ভরাট বন্ধ করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় জলাধারগুলোতে মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। সেই অর্থ পরবর্তীতে অসহায়, দুস্থ ও বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় করা যেতে পারে।

রেলের অব্যবহৃত জমিতে পরিকল্পিতভাবে ক্ষুদ্র দোকানপাট ও বাজার গড়ে তুলে স্থানীয় প্রতিবন্ধী, দুস্থ ও কর্মহীন মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এর ফলে ট্রেনে উঠে ভিক্ষাবৃত্তির প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।

সম্প্রতি রেলমন্ত্রী বলেছেন, “রেলওয়ের অব্যবহৃত ও সম্ভাবনাময় জমিগুলোকে জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণে কাজে লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলে জাতির উন্নয়ন হবে এবং দেশ সমৃদ্ধ হবে।” এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে জনগণ এর বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থেও রেলের পতিত জমিগুলোতে সামাজিক বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। রেললাইনের পাশজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে উঠলে তা যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে, তেমনি যাত্রীদের জন্য মনোরম দৃশ্য সৃষ্টি করবে এবং শীতকালে আগত অতিথি পাখিরও নিরাপদ আবাসস্থল হতে পারে।

রেল ভ্রমণের সময় অনেক যাত্রী হিজড়া সম্প্রদায়ের চাঁদা দাবির কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের যদি রেলের পতিত জমি ও জলাধারভিত্তিক কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যায় এবং তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তারা বিকল্প আয়ের সুযোগ পাবে। এর ফলে চাঁদাবাজির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড কমতে পারে এবং তাদের জীবনমানও উন্নত হবে।

সর্বোপরি, রেলের অব্যবহৃত জমি ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অসহায়, ভূমিহীন ও দুস্থ মানুষের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে রেলের অব্যবহৃত সম্পদ জাতীয় উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

রনি সরকার
সাবেক শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

Exit mobile version