কুড়িগ্রাম, প্রতিনিধি :
রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে সারাদেশে যেখানে শোক, সংযম ও নীরবতা পালনের কথা ছিল, সেখানে কুড়িগ্রাম জেলায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। শোকের দিন রাতজুড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই চলেছে আতশবাজি, ফটকা ফাটানো ও উচ্চ শব্দে ডিজে গান-বাজনা। সবচেয়ে গুরুতর ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই প্রকাশ্য আইন লঙ্ঘনের সময় কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধভাবে নিরব।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শোক দিবসের রাতে কুড়িগ্রাম সদর এলাকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, আবাসিক এলাকা এবং কয়েকটি গ্রামীণ জনপদে থার্টি ফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে ডিজে পার্টি ও আতশবাজির আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দে গান-বাজনার কারণে শোকের পরিবেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব এলাকা জেলা পুলিশের নিয়মিত টহলভুক্ত হলেও কোথাও কার্যকর কোনো পুলিশি হস্তক্ষেপ চোখে পড়েনি।
কুড়িগ্রাম জেলার একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা পুলিশের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পুলিশ কোথাও ছিল না, আর থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ফোনে একাধিকবার জানানো হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি।
সচেতন নাগরিকদের মতে, এটি নিছক সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতি ও অবহেলার নগ্ন উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় শোক চলাকালে আনন্দ-উল্লাস, আতশবাজি ও উচ্চ শব্দে গান-বাজনা বন্ধ করা পুলিশের নিয়মিত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। অথচ কুড়িগ্রামে সেই দায়িত্ব পালনে জেলা পুলিশের দৃশ্যমান ব্যর্থতা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তাইজুল ইসলাম এ বিষয়ে জেলা পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন,
“বিএনপি চেয়ারপারসন ও গণতন্ত্রের সংগ্রামী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারাদেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ও ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ রাত ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বছরের শেষ ও শুরুর অজুহাতে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় থার্টি ফার্স্ট নাইটের নামে ডিজে পার্টি চলেছে। পুলিশ প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। আগেও যেন এমন কর্মকাণ্ড না হয়, সে বিষয়ে কোনো সতর্কতা বা সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়নি। এটা প্রশাসনের গাফিলতি নাকি অবহেলা—আমি জানি না। তবে এর সম্পূর্ণ দায় পুলিশ সুপার মহোদয়কেই নিতে হবে।”
তাইজুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় শোকের মতো সংবেদনশীল সময়ে পুলিশের এমন নিষ্ক্রিয়তা জেলা পুলিশের দায়িত্বজ্ঞান ও পেশাদারিত্বকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রীয় শোকের সময় শুধু প্রশাসনের নয়, জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রীয় শোকের প্রতি সম্মান জানিয়ে আতশবাজি, ফটকা, ডিজে পার্টি ও উচ্চ শব্দের গান-বাজনা থেকে সবাইকে বিরত থাকা উচিত। শোকের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনেকেই মনে করছেন, কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের এই নীরবতা শোক দিবসের মর্যাদাকে অবমাননার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের আইন লঙ্ঘনকে আরও উৎসাহিত করবে। তারা অবিলম্বে দায়িত্বে অবহেলার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী পুলিশ সদস্যদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিংবা পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের এই নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—রাষ্ট্রীয় শোকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়ে কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ ভবিষ্যতে দায়িত্বহীনতার পরিচয় না দিয়ে আইন প্রয়োগে কঠোর ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করবে। অন্যথায় প্রশ্ন থেকেই যায়—আইন ভঙ্গের সময় পুলিশ আসলে কোথায় ছিল?

