এর আওতাধীন পৌর ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে সেবা প্রত্যাশীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তহশিলদার ও কিছু অফিস কর্মচারীর যোগসাজসে ভূমি অফিসগুলো দালালদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে—এমন অভিযোগও করছেন সেবাগ্রহীতারা।
এই অভিযোগের বাস্তব চিত্র মিলেছে সরকারের ‘ভূমি সেবা মেলায়’।
মঙ্গলবার (১৯ মে) কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা ভূমি অফিসে তিন দিনব্যাপী ভূমি সেবা মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা এবং সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) আরিফুল ইসলামসহ অন্যান্যরা।
জেলার সকল উপজেলায় একযোগে এই তিন দিনব্যাপী ভূমি সেবা মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মেলা চলাকালীন সদর ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে পৌর ভূমি অফিসের একটি স্টলে রবিউল ইসলাম পলিন নামের এক ব্যক্তিকে ল্যাপটপ নিয়ে সেবা প্রদান করতে দেখা যায়। তিনি এক নারী সেবাপ্রত্যাশীকে ভূমি উন্নয়ন কর সংক্রান্ত সেবা দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অথচ তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কুড়িগ্রাম পৌর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আব্দুল হাকিম শেখ এবং পাশে বসে ছিলেন কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মঞ্জুরুল ইসলাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিউল ইসলাম পলিন সরকারি কোনো কর্মচারী নন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কুড়িগ্রাম পৌর ভূমি অফিসে ‘দালাল’ হিসেবে পরিচিত এবং হেল্প ডেস্কে নিজস্ব ল্যাপটপ ব্যবহার করে ভূমি সংক্রান্ত কাজ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট অফিসের তহশিলদার ও এসিল্যান্ডের ‘সম্মতি’ নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রবিউল ইসলাম পলিন বলেন,
“আমাকে কেউ বসাননি। ইন্টারনেট কানেকশন ঠিক করার জন্য আমি ১০ থেকে ১৫ মিনিট টেবিলে ছিলাম।”
অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই স্টলে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের তিনি সরাসরি ভূমি সেবা দিচ্ছিলেন, যার প্রমাণ ছবিতেও রয়েছে।
এ ঘটনায় সেবা মেলায় সরকারি কর্মচারী ছাড়া অননুমোদিত ব্যক্তিকে বসিয়ে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে দালালদের পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সেবাগ্রহীতারা। তাদের মতে, এতে ভূমি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতি আরও উৎসাহিত হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলার আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন বলেন,
“ভূমিসেবা যেন আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব হয়—এই লক্ষ্যেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৩ দিনের মেলায় যদি দালাল দিয়ে সেবা দেওয়া হয়, তাহলে ৩৬৫ দিনের সেবা পরিস্থিতি কী, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে।”
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার ও তরুণ সংগঠক রাজ্য জ্যোতি বলেন,
“এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সাধারণ মানুষ বুঝবে না কে কর্মকর্তা আর কে দালাল। প্রকাশ্যে মেলায় অননুমোদিত লোক দিয়ে সেবা দেওয়া মানে দালালদের প্রমোট করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির এক সদস্য বলেন,
“ভূমি অফিসগুলোতে সেবার নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। যারা দেখার কথা, তারাই এতে জড়িত—এ অবস্থায় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।”
জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) জেলা আহ্বায়ক মুকুল মিয়া বলেন,
“সরকারি ভূমি সেবা মেলাতেও যদি দালাল পরিচিত ব্যক্তিকে দিয়ে কাজ করানো হয়, তাহলে স্পষ্ট যে সারা বছরই একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কার্যক্রম চলে। আমরা এর নিন্দা জানাই এবং দুর্নীতিমুক্ত ভূমি সেবা চাই।”
এ বিষয়ে পৌর ভূমি অফিসের তহশিলদার আব্দুল হাকিম শেখের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ঘটনা সম্পর্কে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন,
“বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এমন করার সুযোগ নেই। জানার সঙ্গে সঙ্গে তহশিলদারকে ফোন করে ব্যাখ্যা চেয়েছি এবং তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।”

