
মোঃ মাইদুল ইসলাম ।। ভূরুঙ্গামারী
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসায় অনিয়ম ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ এবং মামলা করার হুমকিকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশাসনিক ও আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল ইসলাম নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম আড়াল করতেই প্রকাশিত সংবাদকে “মিথ্যা ও বানোয়াট” আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে এসব অনিয়ম জেনেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উল্লেখ্য, “সুপারের বরখাস্ত প্রত্যাহার হলেও দায়িত্ব ছাড়ছে না ভারপ্রাপ্ত সুপার, নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগে ৬ মাস ধরে সকলের বেতন বন্ধ”—শিরোনামে তালাশ বিডিসহ একাধিক অনলাইন পোর্টাল ও পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরপরই ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, তার বক্তব্য না নিয়েই সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে এবং তিনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন।
শিক্ষা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত সুপার ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক কোনো সংবাদের প্রতিবাদ জানাতে হলে সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরকে অবহিত করা বা অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এককভাবে প্রতিবাদলিপি দেওয়া কিংবা মামলা করার হুমকি দেওয়া চাকরি বিধি ও শৃঙ্খলা নীতিমালার পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা প্রশাসনের মতে, অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা মামলা করার হুমকি দেওয়া হলে তা ‘Misconduct’ এবং ‘Conduct Unbecoming of an MPO Teacher’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে লিখিত সতর্কীকরণ, কারণ দর্শানোর নোটিশ, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব বাতিল, এমপিও সাময়িক স্থগিত কিংবা গুরুতর হলে বরখাস্ত বা অপসারণ পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল ইসলাম প্রয়োজনীয় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সহ-সুপার পদে আবেদন করেন। এমপিওভুক্তির সময় কাগজপত্র যাচাইয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে তিনি সহ-সুপার পদের পরিবর্তে সহ-মৌলভী হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন শুরু করেন। এই নিয়োগ ও পদবী সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একাধিকবার তার বেতন স্থগিত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন বলেও জানা গেছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. মজিবর রহমানের বয়স সংক্রান্ত অনিয়মের কথাও উঠে আসে। তার অষ্টম শ্রেণির সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্মসাল ১৯৬২ হওয়ায় ২০২২ সালেই চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এমপিও সিটে জন্মসাল ১৯৬৯ উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভারপ্রাপ্ত সুপার দায়িত্ব পাওয়ার পর ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বয়স সংশোধনের প্রত্যয়ন দেন, যার ফলে প্রায় সাত বছর বয়স কমিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ না করেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন বই বিতরণ করা হয়। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সুপারের বক্তব্যসহ ভিডিও ফুটেজও প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে।
সাংবাদিক মহলের দাবি, আলোচিত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রশাসনিক দপ্তর ও নথিপত্র যাচাই করে দলগতভাবে কাজ করা হয়েছে এবং সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী ভারসাম্য বজায় রেখেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক সমস্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার বার্তা পাঠানো হলেও তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান। এছাড়া অফিসে গিয়ে তার নিকট পদক্ষেপ গ্রহণ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যাস্ত আছেন এমন নানা বাহানায় কাটিয়ে যান। স্থানীয়ভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে, কর্মচারী মজিবর রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও তিনি বিষয়টি জেনেও নীরব থেকেছেন এবং তার মাধ্যমে স্থগিত বেতন দিয়েছেন। এছাড়া ৬ মাস বেতন বন্ধ থাকলেও কোন ভূমিকা পালন করেননি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সুপার সাঈদুর রহমান অপরাধ করেছে কিন্তু ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল দায়িত্ব নিয়ে একই পথে হেঁটেছে। একক ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে মাদ্রাসার শিক্ষা পরিবেশ ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীরা টানা ছয় মাস ধরে বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :