বিভেদ নয়, উন্নয়ন হোক আমাদের অঙ্গীকার


HK প্রকাশের সময় : মে ১৬, ২০২৬, ৫:২৯ অপরাহ্ন /
বিভেদ নয়, উন্নয়ন হোক আমাদের অঙ্গীকার

প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

কুড়িগ্রামের মানচিত্রের প্রতিটি ধূলিকণা আমাদের অভিন্ন অস্তিত্বের অংশ। আমাদের স্বপ্ন ছিল এই অবহেলিত জনপদের প্রতিটি প্রান্তর নতুন নতুন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আলোয় আলোকিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি হলো— (১) কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস, (২) ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য স্থল বন্দর এবং (৩) উচ্চ শিক্ষার জন্য কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমটির অস্তিত্ব নেই, দ্বিতীয়টিতে সীমিত পরিসরে পাথরের ব্যবসা চলছে, আর তৃতীয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্ধারিত হয়েছে কুড়িগ্রাম সদরের নালিয়ার দোলায়। দীর্ঘ চার বছরেও জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ফাইলে বন্দী হয়ে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে জেলাবাসীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আলগা হওয়ার পথে, যা মোটেই কাম্য নয়। এই পরিস্থিতির পেছনের কারণ বুঝতে কিছু প্রাসঙ্গিক কাল্পনিক উদাহরণ সামনে আনা প্রয়োজন।

ধরা যাক—কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নালিয়ার দোলায়, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস সচল, কুড়িগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রাজারহাটের ইটাকুড়িতে, কুড়িগ্রাম মেডিকেল কলেজ রাজারহাটের ছিনাইয়ের এলজিডিইতে, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ দাশেরহাটে, টগরাইহাটে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি, ধরলার পাড়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি এবং কুড়িগ্রাম ইকোনোমিক জোন ভোগডাঙ্গা আরজি পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হলো।

এই স্থানগুলোর নাম উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো—কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর সময় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব এলাকার নাম বিভিন্নভাবে আলোচনায় এসেছে। হয়তো আমরা সবাই তখন সন্তুষ্ট হতাম। কিন্তু এর বাইরেও আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর স্বপ্ন আমরা দেখতে পারি—কুড়িগ্রাম নকশিকাঁথা পল্লী ইনস্টিটিউট, হাই-টেক পার্ক, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক পল্লী, আধুনিক স্টেডিয়াম, ব্রহ্মপুত্র তীরে পর্যটন কেন্দ্র, বাংলাদেশ টেলিভিশন উপকেন্দ্র, এগ্রো প্রসেসিং জোন, ফারভেন্ট মাল্টিবোর্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, জিল বাংলা চিনি কল, সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আরডিআরএস কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ আরও অনেক কিছু।

এসব কোথায় হবে—সেটি ঠিক করবেন সম্মানিত পাঠকরাই।

প্রিয় পাঠক, কেউ হয়তো ভাবতে পারেন এগুলো নিছক কল্পনা বা রসিকতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই কুড়িগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত, তাহলে কি আমরা একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ভাইয়ে ভাইয়ে টানাপোড়েনে জড়াতাম? নিশ্চয়ই না। বরং পুরো জেলার উন্নয়ন সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এসব প্রতিষ্ঠান কোথায় রয়েছে? উত্তর খুঁজতে খুব দূরে যেতে হবে না। বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র উপজেলা রাজিবপুর পেরিয়ে পাশের জামালপুর জেলায় গেলেই দেখা যাবে—এই ধরনের বহু শিক্ষা, শিল্প ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সেখানে বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিলেট বা চট্টগ্রামের উদাহরণ টানতে হয়নি; বাড়ির পাশের একটি জেলাই আমাদের সামনে বড় উদাহরণ হয়ে আছে।

তাহলে তারা পেল কিভাবে, আর আমরা পেলাম না কেন? কাউকে দোষারোপ না করেই সহজ উত্তর দেওয়া যায়—এটি আমাদের দুর্ভাগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। কুড়িগ্রামের বর্তমান প্রজন্ম এবং নেতৃত্বে থাকা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে জেলার ভবিষ্যৎ বদলের জন্য।

নেতৃত্ব একটি দ্বিধারী তলোয়ার। ভালো কাজ করলে তার সুফল মানুষ পায় এবং নেতা অমর হন। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার মোহে করা একটি খারাপ কাজ ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা থাকে। নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা ও কর্মফলের অনিবার্য পরিণতি ইতিহাস ও সাহিত্যে বহুবার উঠে এসেছে।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছিলেন—“ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে তার জন্যও হাশরের ময়দানে উমরকে জবাবদিহি করতে হবে।” নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে?

রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির ‘ওল্ড ওম্যান ইজারগিল’ গল্পের ‘দানিয়ো’ চরিত্রটিও নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের প্রতীক। অন্ধকার অরণ্যে পথহারা জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে দানিয়ো নিজের বুক চিরে জ্বলন্ত হৃদয় বের করে পথ আলোকিত করেছিলেন। মানুষ বেঁচে যায়, কিন্তু দানিয়ো মারা যান। নেতৃত্বের মহত্ত্ব এখানেই—নিজের ক্ষতির বিনিময়ে হলেও সমষ্টির কল্যাণ নিশ্চিত করা।

জন সি. ম্যাক্সওয়েল বলেছেন, “নেতৃত্ব মানে পদবী নয়, নেতৃত্ব হলো দায়িত্ব।” আর শেখ সাদী (র.) বলেছেন, “এমনভাবে জীবন যাপন করো যেন তোমার মৃত্যুর পর মানুষ তোমার জন্য কাঁদে, আর তুমি হাসো। এমন নেতৃত্ব দিও না যাতে তোমার বিদায়ে মানুষ আনন্দ প্রকাশ করে।”

কুড়িগ্রামের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের পক্ষ থেকে আমাদের বিনীত অনুরোধ—একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন করে বিভেদ সৃষ্টি করবেন না। এতে ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, যা উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

কুড়িগ্রামের উন্নয়ন কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দাবি হওয়া উচিত—পুরো জেলায় জামালপুরের মতো অসংখ্য শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক। এমন সিদ্ধান্ত আসুক, যাতে হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটে; রক্তক্ষরণ নয়।

আপনারাই আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের শিরোমণি।

লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।