
মোঃ মাইদুল ইসলাম, হামার কুড়িগ্রাম
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (মে দিবস) উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য “সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নবপ্রভাত” সামনে রেখে কুড়িগ্রাম জেলায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হলেও আলাদা ব্যানার, পোশাক ও রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্তভাবে উদযাপনের চিত্র দেখা গেছে। এতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বাস্তব আলোচনা অনেক ক্ষেত্রে আড়ালে পড়ে গেছে বলে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
শুক্রবার (১ মে) কুড়িগ্রাম সদরসহ রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় পৃথকভাবে র্যালি, মানববন্ধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে অংশ নিয়ে নিজেদের পরিচিতি ও প্রচারণামূলক উপস্থিতি তুলে ধরেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পত্রিকায় আলাদা আলাদা ছবি ও কার্যক্রম প্রকাশে ব্যস্ততাও লক্ষ্য করা গেছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, মে দিবসকে ঘিরে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে নানা বক্তব্য উঠে এলেও বছরজুড়ে এসব দাবির বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম একইভাবে অব্যাহত রয়েছে।

জীবনযাত্রার মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতেও শ্রমিকদের ও নিম্ন আয়ের কারণে অনেক শ্রমিক পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পারেন না। বসবাসের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের অভাব রয়েছে অনেকের। চিকিৎসা সেবাও তাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়; সামান্য অসুস্থতাও বড় ধরনের সংকটে রূপ নেয়। অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের সন্তান স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করলেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। দারিদ্র্যের কারণে অতিরিক্ত সহায়ক শিক্ষা—যেমন প্রাইভেট বা কোচিং—গ্রহণের সুযোগ হয় না। ফলে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী ব্যতিক্রমী সাফল্য পেলেও অধিকাংশই পিছিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তা ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের শহরের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা, দামি খাবার গ্রহণ, প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাসহ বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে দেখা যায়; যা সামগ্রিক সামাজিক বৈষম্যের একটি প্রতিফলন হিসেবে উঠে আসে।
শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশাগুলোর মধ্যে রয়েছে—ন্যায্য মজুরি ও সময়মতো বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা, শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ।
বেশিরভাগ দিবস উপলক্ষে প্রতি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগঠনের নেতারা শ্রমিকদের ব্যবহার করে দিবস পালন উপলক্ষে প্রচার-প্রচারণা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন।
এনসিপির ভুরুংগামারি উপজেলা মূখ্য সংগঠক মো: মাহফুজুল ইসলাম (কিরন) বলেন, যে সকল শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে আহত বা নিহত হয়েছে তাদেরকে সরকারিভাবে সম্মাননা ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সকলের কাজ করা প্রয়োজন।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসাইন কায়েকোবাদ জানান, মে দিবস উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভায় তিনি অংশ নিয়েছেন। তবে সরকারিভাবে কী কী প্রদান করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
জেলা শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতাউর রহমান মন্ডল জানান, মে দিবস পালনের জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। নির্দেশনা অনুযায়ী র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের জন্য কোনো খাবার, সম্মাননা বা নির্দিষ্ট অসহায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি।
মে দিবসের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের Chicago শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ৪ মে Haymarket affair-এ একটি বোমা বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হন। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (মে দিবস) পালন শুরু হয়।
আপনার মতামত লিখুন :