২০১১ সালে কুড়িগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের হত্যার ১৫ বছরেও বিচার না পাওয়ায় হতাশ পরিবার; সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জোরালো
মাসুদ রানা ।। বিশেষ প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল বুধবার। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফ সদস্যের গুলিতে নিহত হন কিশোরী ফেলানী খাতুন। ফেলানী খাতুন জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারি গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম নুরু এর মেয়ে। ১৫ বছর ধরে তার হত্যার বিচারের অপেক্ষায় আছে পরিবার।
জানা যায়, সংসারের টানাপোড়েন ঘোচাতে ঘটনার প্রায় ১২ বছর আগে দেড় বছরের কন্যা ফেলানী খাতুনকে কোলে নিয়ে স্ত্রী জাহানারাসহ অবৈধ পথে যান ভারতে পিতা নুরুল ইসলাম নুরু। সেখানে বঙ্গাইগাঁও গ্রামে বসবাস শুরু করেন তারা। পরে ইটভাটার কাজ করেন নুরু। জাহানারাও মাঝেমধ্যে শ্রমিকের কাজ করতেন। এরমধ্যে ফেলানী হয়ে যায় ১৩ বছরের কিশোরী। তখন বাংলাদেশে ফেলানীর বিয়ে ঠিক করে পরিবারের লোকজন। বিয়ের জন্য মেয়েকে নিয়ে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গাইগাও থেকে রওনা দেন বাংলাদেশে বাড়ি উদ্দেশ্যে। আসার সময় মেয়েকে বিয়ের সাজ পড়িয়ে দিয়েছিলেন মা জাহানারা। ওইদিন সন্ধ্যায় সীমান্তে পৌঁছে দালালদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে কাঁটাতার পাড় করে দেয়ার চুক্তি হয় তাদের। ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্তের এক বাড়িতে থাকতে দেন দালালরা।
পরদিন ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে প্রথমে কাঁটাতার পাড় হন বাবা নুরুল ইসলাম। এরপর ফেলানী কাঁটাতার পাড় হতে মই বেয়ে উপরে উঠলে ভারতের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফের এক সদস্য তাকে কাছ থেকে গুলি করলে কাঁটাতারে ঝুলে পড়ে ফেলানীর নিথর দেহ। প্রায় চার ঘণ্টা পর ফেলানীর মরদেহ কাঁটাতার থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ। ময়নাতদন্ত শেষে একদিন পর বিজিবির মাধ্যমে মরদেহ ফেরত দেয় তারা।
এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তােলপাড় শুরু হলে ২০১৩ সালর ১৩ আগষ্ট ভারতের কােচবিহার জেনারেল সিকিউরিটি ফাের্সেস কাের্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। বিএসএফ এর এ কাের্টে স্বাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম ও মামা হানিফ।
ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘােষকে খালাস দেয় বিএসএফ’র বিশেষ আদালত। পরে রায় প্রত্যাখ্যান করে ফের বিচারের দাবি জানায় ফেলানীর বাবা। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘােষকে খালাস দেয়। রায়ের পরে একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কাের্টে একটি রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টােবর রিট শুনানির তালিকা ভুক্ত হয়। কিন্তু ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালর ১৮ মার্চ করােনা মহামারি শুরুর আগে শুনানির জন্য দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি আজ পর্যন্ত।
ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, ‘আমার মেয়ে ফেলানীকে হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেলেও আমি আজ অবধি পর্যন্ত বিচার পেলাম না। আমরা এখনো বিচারের অপেক্ষায় আছি। সীমান্তে আরও মানুষের মৃত্যুর খবর শুনতেছি। আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি জানি সন্তানকে হারানোর বেদনা কতোটা কষ্টের। আমি চাই সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা হোক।
তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তে আর কোন হত্যা দেখতে চাই না। আমার মেয়েকে হত্যার বিচার হলে সীমান্তে আর কোন মানুষকে হত্যার সাহস পাবে না বিএসএফ। আমার বয়স বাড়তেছে। আমি জীবিত অবস্থায় আমার মেয়েকে হত্যার বিচার দেখতে চাই।’
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘ আমার মেয়ে ফেলানীকে হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেলো। এখনো বিচার পেলাম না। দেশে যে সরকারই আসুক, সেই সরকারই যেন আমার মেয়েকে হত্যার বিচার করে। আমি যেন আমার মেয়েকে হত্যার বিচারটা পাই। এটাই আমার সরকারের কাছে দাবী।
তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়ের হত্যার বিচার, আমার সন্তানদের ভরনপোষণের দায়িত্ব সহ যোগ্যতা অনুযায়ী সন্তানদের চাকুরী দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা তা পাইনি। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। বর্তমানে যে সরকারই আসুক ফেলানী হত্যার বিচার সহ আমার সন্তানদের ভরনপোষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা যেন করে এটাই আমাদের দাবী।”
ফেলানীর ছোট ভাই আক্কাছ আলী বলেন, ” আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে।
আমার বোনের হত্যার বিচারের জন্য আমার বাবা মা এখনো কান্না করে। আমি ভাই হিসেবে আমার একটাই দাবী আমার বোনের হত্যার বিচার চাই।”
প্রতিবেশী শরীফ মিয়া বলেন, “দীর্ঘ ১৫ বছর হয়ে গেলেও এখনও সীমান্তে ফেলানী হত্যার বিচার আমরা পাইনি। যে সরকারই সর্বপ্রথম যেন ফেলানীর বিচারটা আগে করা হয়। ১৫ বছর ধরে ফেলানী হত্যার মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার বাবা মা কষ্ট পাচ্ছে। ফেলানী হত্যার বিচার যেন আগে করা হয়।”
এবিষয়ে কথা বলতে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন জাহান লুনা এর সাথে মুঠো ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, ফেলানীর মৃত্যু বার্ষিকী নিয়ে কোন কর্মসূচির নির্দেশনা নেই। নির্দেশনা পেলে কর্মসূচি গ্রহন করা হবে।

