ধরলার সৌন্দর্য ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন, থমকে আছে প্রস্তাবিত পার্ক নির্মাণ


Hamar Kurigram প্রকাশের সময় : মার্চ ৫, ২০২৬, ৯:১১ অপরাহ্ন /
ধরলার সৌন্দর্য ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন, থমকে আছে প্রস্তাবিত পার্ক নির্মাণ

আশির্বাদ রহমান ।। হামার কুড়িগ্রাম

উত্তরাঞ্চলের নদীমাতৃক জেলা কুড়িগ্রাম। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই জেলায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের অভাব নেই, রয়েছে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তাসহ প্রায় ১৬টি নদ-নদী এবং চার শতাধিক চরাঞ্চল। নদী ও চরঘেরা এই জনপদের মানুষ সহজ-সরল জীবনযাপন করলেও আধুনিক বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জেলার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা এখন কুড়িগ্রামের মানুষের গর্ব—ধরলা সেতু।


কুড়িগ্রাম জেলার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরসহ সীমান্তবর্তী এলাকার বাণিজ্য ও যাতায়াত সহজ করতে ২০০০ সালে ধরলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৩ সালের শেষ দিকে উদ্বোধন করা হয় বহু প্রত্যাশিত এই সেতুটি। এরপর থেকেই কুড়িগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে শুরু করে। জেলার মানুষের কাছে এটি শুধু একটি সেতুই নয়, বরং স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।


ধরলা নদীর ওপর গড়ে ওঠা এই দৃষ্টিনন্দন সেতুটি বর্তমানে কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। ঈদুল ফিতরসহ বড় বড় ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের সময় ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে সেতুর দুই পাড়। বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে হাজারো মানুষ ধরলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় জমায় এখানে। কিন্তু এত বড় জেলার জন্য একটি স্থায়ী ও পরিকল্পিত বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় মানুষকে অনেকটাই বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে।


বাস্তবতা হলো, প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই জেলায় এখনো কোনো আধুনিক বিনোদন পার্ক গড়ে ওঠেনি। ফলে বড় কোনো উৎসব এলেই মানুষ ভিড় জমায় ধরলা সেতুর পূর্ব পাড়ে। অনেকের কাছে এটিই যেন জেলার একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র। কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় দর্শনার্থীরা সেখানে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না।


এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কুড়িগ্রাম ধরলা সেতুর পূর্ব পাশে মাধবরাম মৌজায় একটি পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানার উদ্যোগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন জমিতে ‘ডিসি পার্ক’ নামে পার্কটি নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়। পার্ক নির্মাণের লক্ষ্যে নদীর পাড়ের নিচু জমি বালু দিয়ে ভরাট করার কাজও শুরু করা হয়েছিল।


তবে পার্কটির নামকরণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক এবং আইনি নোটিশের খবর সামনে আসার পর থেকে পুরো প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। শুরুতে যে উদ্দীপনা ছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই থমকে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় জেলার মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে হতাশা।


স্থানীয়দের মতে, ধরলা সেতুর পূর্ব পাড়ে একটি আধুনিক পার্ক গড়ে উঠলে জেলার সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি জেলার মানুষও একটি স্থায়ী বিনোদন কেন্দ্র পাবে, যেখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে অবসর সময় কাটানো সম্ভব হবে।


জেলার সচেতন মহল মনে করেন, ধরলা সেতুকে কেন্দ্র করে যদি পরিকল্পিতভাবে একটি পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা যায়, তাহলে কুড়িগ্রাম শুধু উত্তরাঞ্চলেই নয়, সারা দেশের পর্যটন মানচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এবং জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক সহযোগিতা।


এ বিষয়ে জেলার সাধারণ মানুষের দাবি, নামকরণ নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পার্কটির বাস্তবায়ন। তারা চান প্রশাসন এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে পার্কটির নির্মাণ কাজ শুরু ও শেষ করা হোক।

নাম যাই হোক, কুড়িগ্রামের মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন—ধরলার পূর্ব পাড়ে প্রস্তাবিত সেই পার্কটি কি সত্যিই একদিন বাস্তবে দেখতে পারবে জেলার মানুষ?