তিস্তা ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগে তোলপাড় : ‘দলীয় প্রভাব’ নিয়েও বিতর্ক৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল


Hamar Kurigram প্রকাশের সময় : মার্চ ৯, ২০২৬, ৭:২৫ অপরাহ্ন /
তিস্তা ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগে তোলপাড় : ‘দলীয় প্রভাব’ নিয়েও বিতর্ক৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল

শফিকুল ইসলাম বেবু, কুড়িগ্রাম

তিস্তা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে বাস্তবায়নাধীন একটি সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের জিও টেক্সটাইল ব্যাগ সরবরাহ ও ব্যবহারের অভিযোগে ৬ হাজার বালুভর্তি ব্যাগ বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট কারিগরি টাস্কফোর্স। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুতর অনিয়ম, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে কুড়িগ্রামে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাব খাঁ এলাকায় তিস্তা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী ব্যবহৃত জিও টেক্সটাইল ব্যাগের পুরুত্ব ন্যূনতম ৩ মিলিমিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরবরাহকৃত একাংশ ব্যাগে সেই মান বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটির কার্যাদেশ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া হলেও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল একটি ছায়া ঠিকাদারি ব্যবস্থার হাতে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান প্রকল্পটির বাস্তব তদারকিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তার প্রভাবেই কাজটি পরিচালিত হচ্ছিল। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩০ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে নিক্ষেপের কার্যক্রম চলছিল।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী জিও ব্যাগ নদীতে ফেলার আগে মান পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার আগেই কিছু ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্কফোর্স, প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে, ২০২৫ সালের জুন মাসে ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাগের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠায়।

জুলাই ২০২৫ মাসে প্রকাশিত পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৬ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেনি। ফলে সেগুলো সরাসরি বাতিল ঘোষণা করা হয়। টাস্কফোর্সের সরেজমিন পরিদর্শনেও সরবরাহকৃত ব্যাগের পুরুত্বে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহ চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রমাণিত হলে কার্যাদেশ বাতিল, জরিমানা কিংবা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট করার বিধান রয়েছে।”

এদিকে ব্যাগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গত ৫ মার্চ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান দলীয় কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রাম কার্যালয়ে উপস্থিত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিব, সদস্য কফিল উদ্দিন এবং পৌর বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুল আলীম।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের কাছে ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিলের কারণ জানতে চান। এ সময় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্ক চলে। উপস্থিত কয়েকজনের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “টাস্কফোর্স সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী কাজের মান পরীক্ষা করেছে। নির্ধারিত ৩ মিলিমিটার পুরুত্ব না থাকায় ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব গ্রহণ করা হয়নি।”

অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার বক্তব্য জানতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি বার্তাটি দেখেছেন, তবে এ বিষয়ে কোনো জবাব দেননি।

অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুর রহমান রানা বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ঘটনা জানতে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা ওসমান ফারুক, গোলাম রব্বানী ও আবুল কালাম আজাদসহ অনেকেই বলেন, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে নদীভাঙন প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা কার্যকর হবে না। এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন ও সম্পদ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারোডোব এলাকায় ধরলা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি ভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের কার্যক্রমেও একই ঠিকাদারি গোষ্ঠীর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে একই গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছে। যদিও মোস্তাফিজার রহমান এসব অভিযোগ নাকচ করে দাবি করেছেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও প্রভাবের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক আরও ঘনীভূত হতে পারে।