তামজিদ হাসান তুরাগ
খাতা-কলমে সরকারি সারের ডিলারের থাকার কথা থাকলেও বাজারে নেই ডিলার। তিনি ব্যবসা করছেন একই জেলার একই উপজেলার ভিন্ন ইউনিয়নে। সেখানে নেই তার কোনো বৈধ ব্যবসা করার ডিলারশিপ। নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই কার্যক্রম চললেও গত ১০ বছরে তা নজরে পড়েনি কৃষি কর্মকর্তাদের।
ঘটনাটি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নে। বিধিমতে ওই ইউনিয়নে সরকারি সারের ডিলার ঘর থাকার কথা আশিক বীজ ভান্ডারের স্বত্তাধিকারী মমিনুল ইসলামের। কিন্তু ডিলার নেওয়ার ১০ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও একদিনের জন্যও সেখানে বিক্রি করেননি সার। বরং তিনি একই উপজেলার ভিন্ন ইউনিয়নে বিক্রি করছেন সার। যার ফলে ওই এলাকার বাসিন্দারা বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি ন্যায্যমূল্যের সার থেকে। এলাকাবাসী বলছে এতোদিন ধরে তারা জানেই না যে তাদের বাজারে সারের ডিলারশিপ আছে। ফলে তাদের উচ্চমূল্যে অধিক যাতায়াত ভাড়া দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।
সরজেমিনে রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নের আমতলী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে তিনটি সারের খুচরা দোকান। সেখানে মেসার্স আশিক বীজ ভান্ডারের ডিলার পয়েন্ট থাকার কথা। তিনি ২০১০ সালে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের বীজ বিপণনের লাইসেন্স। পরবর্তীতে একই গুদাম ঘর দেখিয়ে তিনি বনে গেছেন সারের ডিলার।
আমতলী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ (৫০) বলেন, এটি যে ডিলার আছে হামরা তো জানি না। কে যে ডিলার তার দোকান কোনটা জানি না। আমরা সার কিনি খুচরা দোকান থাকি, বেশি দাম দিয়া।’
এ সময় তিনি আমতলী বাজারে ডিলার দেওয়ার জোর অনুরোধ জানান। আরেক কৃষক অধির রায় বলেন, ‘খুচরা বাজারে যারা সার বিক্রি করে তাদের কাছে সারের দাম বেশি। প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বেশি করে দাম নেয়। আমরা কৃষকরা নিরুপায়। আমরা কম দামে সার পাই না। আপনার কাছেই প্রথম জানলাম যে এই বাজারে সারের পয়েন্ট আছে। কোনো দিন দেখি নাই যে এখানে সার বিক্রি করে। আমরা আমাদের এখানে ডিলার চাই যাতে করে কম দামে সার কিনতে পারি।
স্থানীয় শিক্ষক অতুল চন্দ্র রায় বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে এই এলাকায় কৃষি কাজ করি। প্রতি বছরই আমাদের সার আনতে হয় পাশের ইউনিয়ন থেকে। আমরা জানিই না যে এখানে ডিলার পয়েন্ট আছে। আর এখানে যে সারের চাহিদা নেই এমনটা নয়। প্রতি বছরই আমাদের সার কিনতে হয়। অনেক দাম দিয়ে। আমরা চাই এখানে সারের ডিলার আসুক। কৃষি অফিস একটা ব্যবস্থা নিক।
চাকিরপশার ইউনিয়নের আমতলী বাজারে আশিক বীজ ভান্ডার নামের ডিলারের দেখা না মিললেও সেই ডিলার পয়েন্টের দেখা মিললো পার্শ্ববর্তী উমর মজিদ ইউনিয়নের ফরকেরহাট বাজারে। ডিলারের স্বত্বাধিকারী মমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আমি এখানে অনেক বছর ধরে ব্যবসা করি। আমি যে এখানে ব্যবসা করি সেটা অফিসের লোক ও জানে। আমি এখানে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমতলী বাজারে আমার ডিলার পয়েন্ট ঠিক আছে কিন্তু আমি যখন ডিলার পয়েন্টটা নিয়েছিলাম তখন সেই বাজারে তেমন ব্যবসা হতো না তাই এখানে ব্যবসা করি।
জানতে চাইলে রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, আমরা উপজেলার সকল ইউনিয়ন পর্যায়ের সারের ডিলারদের সাথে বৈঠক করেছি। সব সার ডিলারদের কাছে মতামত নিয়েছি। তারপর আমরা বিধি মোতাবেক সারের ডিলারদের এক একটি ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করেছি।
তবে এক ইউনিয়নের ডিলার আরেক ইউনিয়নে সার বিক্রি করতে পারে কী না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি কুড়িগ্রামের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যে ইউনিয়নে ডিলার পয়েন্ট সে ইউনিয়নে সার বিক্রয় করতে হবে। এটাই নিয়ম।
এক ইউনিয়নের ডিলার আরেক ইউনিয়নে সার বিক্রি করতে পারে কী না এমন প্রশ্নের জবাবে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান, আসলে বিষয়টি কৃষি কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন। তবে বিষয়টি আপনার কাছেই জানতে পারলাম। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো বিষয়টি।
চাচাকে বাবা বানিয়ে ডিলার হয়েছেন মমিনুল
সূত্র বলছে ফরকেরহাটের বাসিন্দা ও বিএনডিসি সারের ডিলার আল রায়হান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী দুলাল মিয়া ও আশিক বীজ ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মমিনুল ইসলাম তারা দুজন একই পিতার সন্তান। কিন্তু তারা যখন ডিলারের লাইসেন্স করেছিলেন তখন তারা পিতা ভোটার আইডি কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে করছেন পিতা পরিবর্তন। চাচাকে বানিয়েছেন বাবা। দুলাল মিয়া লাইসেন্স করেছিলেন ২০০৩ সালে সেখানে তিনি পিতার নাম দিয়েছিলেন ছুমাইল উদ্দিন। আর ২০১০ সালে তার ভাই লাইসেন্সে পিতার নাম দেখিয়েছেন আ. ছালাম। তবে এ বিষয়ে সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন মমিনুল ইসলাম তিনি বলেছেন, নানাবিধ সুবিধার জন্য তিনি তার চাচাকে বাবা বানিয়েছেন। কারণ তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান বলেন, যদি এনআইডি জালিয়াতি হয়ে থাকে তাহলে এটি গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন।

