ডেস্ক নিউজ
বন্যা, নদীভাঙন, খরা আর অনিশ্চিত কৃষির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন সম্ভাবনার নাম এখন গবাদিপশু পালন। কৃষি থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ায় জেলার শত শত চরবাসী গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনকে প্রধান জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এতে একদিকে যেমন পরিবারের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্যোগ মোকাবিলায়ও তৈরি হচ্ছে আর্থিক নিরাপত্তা।
পরিবেশবিদ ও কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত এক দশকে জেলায় বন্যা ও নদীভাঙনের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বহু ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার গরু, ১১ হাজার মহিষ, ৭ লাখ ৪৫ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৪৯ হাজার ভেড়া এবং ৩ হাজার ২১৬টি ঘোড়া রয়েছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশই চরাঞ্চলে লালন-পালন করা হয়।
সম্প্রতি সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চরে অসুস্থ একটি গরু দেখতে গিয়ে স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান।
খামারি ওসমান গনী বলেন, “গরু পালন এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। একটি বাছুর এক বছরেই ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। প্রয়োজন হলে গরু দেখিয়েই এনজিও থেকে ঋণ পাওয়া যায়, পরে গরু বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব।”
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া চরের বাসিন্দা মো. করিম জানান, কৃষিকাজে তেমন লাভ না হওয়ায় তিনি চারটি গরু ও পাঁচটি ছাগল পালন করছেন। বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। পশু অসুস্থ হলে নৌকায় করে বাজারে নিয়ে যান অথবা স্থানীয় প্রাণিচিকিৎসকের সহায়তা নেন।
সাহেবের আলগা চরের বাদশা মিয়া বলেন, “চরের মানুষের জন্য গরু পালন শুধু একটি পেশা নয়, এটি বেঁচে থাকার অবলম্বন।”
একই চিত্র নারী খামারিদের মধ্যেও। পোড়ার চরের মনি বেগম বলেন, স্বামী ঢাকায় কাজ করলেও তিনি বাড়িতে গরু পালন করেন। চরের প্রাকৃতিক ঘাসে কম খরচে গরু মোটাতাজা হয়। পরে বিক্রি করে বছরে ভালো আয় করা যায়।
তিনি জানান, ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত আবহাওয়ার সতর্কবার্তা ও পশু পরিচর্যার পরামর্শ পান।
যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর বলেন, ইউনিয়নের ২৫টি চরে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের বসবাস। পুরুষদের অনেকেই কর্মসূত্রে বাইরে থাকায় নারীরাই এখন গবাদিপশু পালন করে সংসারের আয় বাড়াচ্ছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর ঘাস জন্মায়, ফলে খাদ্য ব্যয় কম হয় এবং খামারিরা বেশি লাভবান হন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত টিকাদান, চিকিৎসা ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে গবাদিপশুকে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে রাখতে হবে। শুকনো খাদ্য সংরক্ষণ, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা এবং বন্যার দূষিত পানি বা ডুবে থাকা ঘাস খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রহিম উদ্দিন হায়দার রিপন জানান, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, এনজিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভয়েস কলের মাধ্যমে চরবাসী সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিন আগেই বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে থাকেন।
কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, কুড়িগ্রামের প্রায় সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ চরাঞ্চলের মানুষ বছরের অধিকাংশ সময়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করেন। তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবাদিপশু পালনকে আরও সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা জরুরি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সত্ত্বেও চরাঞ্চলের মানুষের কাছে গবাদিপশু পালন এখন শুধু একটি পেশা নয়, বরং টিকে থাকার শক্তিশালী হাতিয়ার এবং স্বাবলম্বিতার নতুন পথ।






