কুড়িগ্রামে পাম্পগুলোতে তেল নেই, অথচ খোলা বাজারে লিটারপ্রতি ২০০–৩০০ টাকায় বিক্রি—সিন্ডিকেটের অভিযোগ, নীরব প্রশাসন


HK প্রকাশের সময় : মার্চ ২৩, ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ন /
কুড়িগ্রামে পাম্পগুলোতে তেল নেই, অথচ খোলা বাজারে লিটারপ্রতি ২০০–৩০০ টাকায় বিক্রি—সিন্ডিকেটের অভিযোগ, নীরব প্রশাসন

বিশেষ প্রতিবেদন | হামার কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রাম জেলায় তীব্র জ্বালানি তেল সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যানবাহন চালক ও সাধারণ মানুষ। জেলার অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে তেলের সরবরাহ না থাকায় প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি ও ক্ষোভ। কিন্তু একই সময়ে খোলা বাজারে লিটারপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় তেল বিক্রির ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—পাম্পে তেল না থাকলে এই তেল আসছে কোথা থেকে?

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন পাম্পে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ নানা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না। কিছু পাম্পে অল্প সময়ের জন্য তেল সরবরাহ করা হলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক পাম্পে তেল সংকটের কারণে বন্ধ ঘোষণা করে বাঁশের বেড়া দিয়ে রাখা হয়েছে।

এদিকে পাটেশ্বরী এলাকায় একটি পাম্পে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ বাইকাররা সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেন, যা পরিস্থিতির তীব্রতা আরও স্পষ্ট করে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, পাম্পে তেল না থাকলেও খোলা বাজারে সহজেই বেশি দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে।

মোটরসাইকেল চালক সাদিকুল ইসলাম সাদেক বলেন, “পাম্পে গেলে বলা হয় তেল নেই, কিন্তু দোকানে গেলে ২৫০-৩০০ টাকায় তেল পাওয়া যায়। যদি পাম্পে তেল না থাকে, তাহলে দোকানদাররা কোথা থেকে তেল পাচ্ছে? এটা স্পষ্ট একটি সিন্ডিকেট।”

ইজিবাইক চালক মেহেদী হাসান শাওন একই অভিযোগ তুলে বলেন, “গাড়ি নিয়ে পাম্পে গিয়েও তেল পাই না, অথচ বাজারে ঠিকই দ্বিগুণ দামে পাওয়া যাচ্ছে। এটা রহস্যজনক। প্রশাসন জানলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”

আরেক চালক রনি সরকার বলেন, “২৫ কিলোমিটার দূর থেকে এসে তেল পাইনি। সরকার বলছে তেল আছে, কিন্তু কুড়িগ্রামে নেই কেন? বাইরে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—এটা স্পষ্ট সিন্ডিকেট। কঠোর অভিযান হলে আসল চিত্র বের হয়ে আসত।”

মোটরসাইকেল চালকদের দাবি, কিছু অসাধু চক্র পাম্প থেকে তেল সরাসরি গ্রাহকদের না দিয়ে লাইসেন্সবিহীন খুচরা দোকানে সরবরাহ করছে রাতের বেলায়। খোলা দোকানে চড়া দামে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাম্প মালিকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পাম্প ম্যানেজার জানান, ডিপো থেকেই পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তার দাবি, জেলার হাতে গোনা কয়েকটি পাম্প কিছু তেল পেলেও সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সেক্রেটারি কাজল বলেন, জেলায় দৈনিক প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ লিটার জ্বালানির চাহিদা থাকলেও সরবরাহ তার তুলনায় অনেক কম। ডিজেলের ক্ষেত্রে যেখানে দৈনিক প্রায় ৪ লাখ লিটার প্রয়োজন, সেখানে ৫০ হাজার লিটারও পাওয়া যাচ্ছে না। আর পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা ৪০ থেকে ৬০ হাজার লিটার হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার।

তিনি আরও জানান, দেশে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিনটি কোম্পানি জ্বালানি তেল সরবরাহ করে। কুড়িগ্রামে পদ্মার ৯টি পাম্প থাকলেও সেখানে সরবরাহ কম; অন্যদিকে যমুনা ও মেঘনার প্রায় ২০টি পাম্প সীমিত পরিমাণ তেল পাচ্ছে, যা মোট চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, “পাম্প মালিকরা এসবের সঙ্গে জড়িত নয়। কেউ প্রমাণ দিতে পারলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে প্রশাসনের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। যদিও গত ২০ তারিখ কিছু অভিযান পরিচালনার কথা জানা গেছে, তবে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—
পাম্পে তেল নেই, অথচ কালো বাজারে চড়া দামে তেল মিলছে কীভাবে?

এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ও কার্যকর ব্যবস্থা না এলে কুড়িগ্রামের জ্বালানি সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।