Site icon হামার কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রামে হোটেল বয়ের কাজ করেও সেরা সাফল্য কৌশিকের

আহসান হাবীব নীলু , কুড়িগ্রাম

ভূমিহীন পরিবার। ভিটেমাটির এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব মোচন ও লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেল বয় ও টিউশনির কাজ করেছেন কৌশিক। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি। সব বাধা পেরিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন বিশাল সরকার কৌশিক।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কৌশিকের এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিদারুণ কষ্ট আর সংগ্রামের গল্প। দারিদ্র্য, ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাঁর স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে অন্যের জমিতে গড়ে ওঠা জীর্ণ কুটিরে বসবাস কৌশিকদের। ছোটখাটো তিনটি ভাঙাচোরা চালাঘরে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বাঁশঝাড়ের এক কোণায় খোলা রান্নাঘর।

কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া। সামান্য সম্মানী পান। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় টি-স্টল চালান। সামান্য এই আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।

সংসারের বোঝা আরও বড় হয়েছে ঋণের দায়ে। অভাব আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন মা কণা রানী। কিস্তি শোধ করার মতো আয় না হওয়ায় বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়। সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির ভার সইতে না পেরে ধার করেন আরও ৫০ হাজার টাকা। এভাবেই ঋণের জালে জড়িয়ে ধুঁকছে সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি।

কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরের কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন কৌশিক। সেখান থেকে এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। পরে ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে।

কৌশিকের সফলতার পেছনে রয়েছে সংগ্রাম আর বেদনার নানা গল্প। তিনি জানান, স্কুলে ভর্তির পর বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট আর জুতা দিয়েই শুরু হয় তাঁর স্কুলজীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাভাবে কোনো প্রাইভেট টিউশনি পড়তে পারেননি। পরে কয়েকজন শিক্ষক তাঁকে বিনা মূল্যে পড়িয়েছেন। এসএসসিতেও প্রবাসী এক ব্যক্তির সহায়তাসহ শিক্ষকদের আন্তরিকতায় তাঁর স্বপ্ন পূরণের যাত্রা অব্যাহত থাকে।

কৌশিক আরও বলেন, অটোরিকশার ভাড়া না থাকায় অনেক দিন স্কুল ও কলেজে যাওয়া হয়নি। সারাদিন অভুক্ত থেকেছেন। ক্ষুধার যে কী কষ্ট, কেউ বুঝবে না। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু পড়াশোনার খরচ দিতে পারছিলেন না তাঁর বাবা। এবারও কয়েকজন শিক্ষক তাঁকে বিনা মূল্যে টিউশনি পড়িয়েছেন এবং অন্যান্য সহায়তা করেছেন। নিজেও হোটেল বয়ের কাজ করে পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন।

কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার জানান, তাঁর তিন ছেলেমেয়েই মেধাবী। একসময় সড়কের ধারে সরকারি খাসজমিতে তাঁর একটি ছোট টি-স্টল ছিল। ২০২০ সালে উচ্ছেদের সময় ঘরবাড়ির সঙ্গে দোকানটিও উচ্ছেদ হয়। এরপর এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগান ও বাঁশঝাড়ের পাশে মাথা গুঁজে আছেন তাঁরা। বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়েন। একমাত্র মেয়ে সূচনাকে এসএসসি পাস করার পর বিয়ে দিয়েছেন।

বড় ভাই কর্ণ জানান, চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও ছোট ভাইয়ের সেরা ফলাফলে আনন্দের বদলে কান্না এসেছিল। তাঁর স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, সেটাই এখন পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার কারণ।

মা কণা রানী জানান, তাঁদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ মেটে না। তার ওপর রয়েছে ঋণের বোঝা। এ অবস্থায় ছেলের স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কোনো উপায় দেখছেন না তিনি। ছেলের স্বপ্ন পূরণে সরকার ও হৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান কণা রানী।

অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে কৌশিকের এই সাফল্য নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে তাঁর পরিবারকে। তবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা ও সহযোগিতার হাত।

Exit mobile version