
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর নুরানি তা’লিমুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ১৩ বছর বয়সী এক আবাসিক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানের মুহতামিমের (প্রধান শিক্ষক) বিরুদ্ধে। গত সোমবার (১৮ মে) রাতে এ ঘটনা ঘটে। মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
অভিযুক্ত মুহতামিমের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। বলাৎকারের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় তাকে রাতের বেলায় এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি নিজ বাড়িতে চলে যান বলে জানা গেছে।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে আবাসিক ও অনাবাসিক মিলিয়ে প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ জনের বেশি আবাসিক। নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীও আবাসিক বিভাগের ছাত্র। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার রাতে মুহতামিম ওই শিক্ষার্থীকে নিজের কক্ষে নিয়ে যান। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিষয়টি টের পেয়ে বাইরে থেকে কক্ষের দরজা আটকে স্থানীয়দের খবর দেয়।
স্থানীয়রা এসে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে বিষয়টি মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুরকে জানানো হয়। স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর অভিযুক্ত শিক্ষককে মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন,
“মুহতামিম ও ছাত্র দুজনই বলাৎকার কথা স্বীকার করেছেন। মুহতামিম বলেছেন, ‘হ্যাঁ আমি দোষী।’ তার স্বীকারোক্তির জবানবন্দি স্থানীয় অনেকের কাছে রেকর্ড আছে। পরে স্থানীয় মুরুব্বিরা বসে ওই শিক্ষককে মাদ্রাসা থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। মুরুব্বিরা যেটা ভালো মনে করেছেন সেটা করেছেন। এখানে আমার কিছু বলার নেই।”
আরেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন,
“এর আগেও দুই শিক্ষার্থীকে বলাৎকার অভিযোগ উঠেছিল। তিনি স্বীকারও করেছিলেন। ক্ষমা চাওয়ায় তাকে মাদ্রাসায় রাখা হয়। কিন্তু এবার মুরুব্বিরা আর তাকে রাখতে চাননি।”
বিচার কিংবা মামলা ছাড়া তাকে চলে যেতে দেওয়ার বিষয়ে ওই শিক্ষক বলেন,
“মুরুব্বিরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুহতামিমকে রাতেই কুড়িগ্রাম শহর পর্যন্ত রেখে আসা হয়েছে। পরে তিনি সিরাজগঞ্জে নিজ বাড়িতে চলে গেছেন।”
নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থী বর্তমানে আর মাদ্রাসায় থাকছে না। সে বর্তমানে ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযুক্ত মুহতামিম সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন,
“আমাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে মাদ্রাসা চালিয়ে আসছি। কিছু লোক শত্রুতা করে আমাকে অপবাদ দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। স্থানীয় কিছু শিক্ষক কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে ফাঁসিয়েছে। আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি বিচার করবেন।”
তিনি আরও বলেন,
“আমি কোনও দায় স্বীকার করিনি। কেন করবো। রাতে ওই ছাত্র আমার কক্ষে তার ভেজা কাপড় শুকাতে দিতে আসে। এমন সময় বাইরে থেকে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে কেউ দোষ দিতে চাইলে আমি কী করতে পারি। মিটিংয়ে আমাকে তারা জিজ্ঞাসা করেছে ওই ছাত্র আমার ঘরে ঢুকেছিল কিনা? আমি বলেছি ঢুকেছিল। আমি তো মিথ্যা বলিনি। কিন্তু তার মানে তো এই নয় আমি বলাৎকার করেছি।”
মুহতামিম আরও বলেন,
“সুমন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির নেতৃত্বে মিটিং করা হয়। তারা আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। তারা টাকা চাইবে কেন? আমি এতদিন ধরে মাদ্রাসাটি চালিয়ে আসছি। কিন্তু আমাকে অপবাদ দিয়ে বিদায় করা হলো। আপনাদের যা খুশি লেখেন। আল্লাহ সব দেখেছেন, তিনি সব জানেন। তিনিই বিচার করবেন।”
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি আব্দুল গফুর বলেন,
“আমার কাছে মনে হয়েছে মুহতামিমকে ফাঁসানো হয়েছে। তার সঙ্গে শত্রুতা ছিল। ওই ছাত্রের বাবা আমাকে ফোন করে বলেছেন তার ছেলেকে দিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আমাকে মিটিংয়ে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু আমি যাইনি। স্থানীয় কিছু লোক মিলে মিটিং করে হুজুরকে বিদায় করেছে। যদি হুজুরের দোষ থাকে তাহলে তার শাস্তি হোক। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়ে থাকে তাহলে যারা তাকে মিথ্যা অভিযোগ দিলো তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। এগুলোর সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। ছাত্রের বাবাও তা চেয়েছেন আমাদের কাছে।”
আপনার মতামত লিখুন :