
আবহাওয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুড়িগ্রামে দিনের তাপমাত্রা ২২ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও রাত ও ভোরে তা নেমে যাচ্ছে ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বড় পার্থক্যের সঙ্গে হিমেল বাতাস ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা যুক্ত হওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে। শুক্রবার রাজারহাট কৃষি পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, আজ কুড়িগ্রামে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চারদিকে নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় কুড়িগ্রামে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা অনেক বেশি থাকে, যা অনেক সময় ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশে পৌঁছায়। খোলা চরাঞ্চলে গাছপালা ও টেকসই ঘরবাড়ির অভাব থাকায় হিমেল বাতাস সরাসরি মানুষের শরীরে আঘাত হানে। ফলে তুলনামূলক কম তাপমাত্রাতেও শীত কনকনে অনুভূত হয়।
চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশার চিত্র আরও করুণ। চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের কড়াই বরিশাল চরের বাসিন্দা আব্দুল মোমেন বলেন, দিনে কাজ না করলে রাতে খাবার জোটে না। কম্বল তো দূরের কথা, ছেঁড়া কাপড় গায়ে দিয়েই শীতে রাত কাটাতে হয়। রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী হাঁসারপাড় এলাকার বাসিন্দা সন্ধ্যা রানী জানান, শীতে তাঁর সন্তানরা জ্বর ও সর্দিতে ভুগছে। খাবারের সংকট আর কম্বলের অভাবে দিন কাটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চর ও নদীতীরবর্তী শীতার্ত ও হতদরিদ্র মানুষের কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকায় অনেক প্রকৃত দরিদ্র পরিবার সরকারি সহায়তার আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। শীতের কারণে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় দিনমজুর, জেলে ও নৌকানির্ভর মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট।
শীতের প্রকোপে চরাঞ্চলে সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, শীতজনিত রোগে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অপুষ্টির সঙ্গে ঠান্ডা যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে বলে তিনি সতর্ক করেন।
জনস্বাস্থ্য ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের সঙ্গে খাদ্য সংকট ও দারিদ্র্য একসঙ্গে থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। তারা বলছেন, শুধু কম্বল বিতরণ করলেই হবে না; পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ জরুরি।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শীতার্ত মানুষের সহায়তায় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, চর ও নদীতীরবর্তী এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জেলায় ২৭ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছানো হবে।
সচেতন মহলের মতে, কুড়িগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত চরাঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ জরিপ, পর্যাপ্ত কম্বল ও শীতবস্ত্র, খাদ্য সহায়তা এবং ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এই শীতে জেলার ৪৬৯টি চরের সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষসহ লাখো হতদরিদ্র মানুষ আরও গভীর সংকটে পড়তে পারেন।
আপনার মতামত লিখুন :