কুড়িগ্রামের কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বদরুজ্জামান মিয়া (বীর প্রতীক)


Hamar Kurigram প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫, ৮:৫৫ পূর্বাহ্ন /
কুড়িগ্রামের কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বদরুজ্জামান মিয়া (বীর প্রতীক)

(জন্মঃ ০১, নভেম্বর, ১৯৪৪ এবং মৃত্যুঃ মে, ২০১২ )

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে।

জন্ম,শিক্ষা জীবন ও পরিবারঃ

১৯৪৪ সালের ১ নভেম্বর মিয়াপাড়া, শিমুলবাড়ী গ্রাম, ফুলবাড়ী উপজেলায় জন্মগ্রহল করেন।তার বাবার নাম নজিরুজ্জামান মিয়া এবং মায়ের নাম রোকেয়া সানম। তার স্ত্রীর নাম বিউটি বেগম ও নূরমহল বেগম। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁর পিতা নজিরম্নজ্জামান মিয়া (বিএবিটি) ফুলবাড়ী জছিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বদরম্নজ্জামান মিয়া প্রথম জীবনে ফুলবাড়ী জছি মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছু দিন শিক্ষকতা করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

কর্মজীবনঃ মোঃ বদরুজ্জামান মিয়া ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। ১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল লালমনিরহাট হয়ে ধরলা নদী পেরিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অভিমুখে আসে। তখন ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও স্থানীয় ছাত্র-যুবকদের সমন্বয়ে গড়া মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করেন। এই যুদ্ধে মো. বদরুজ্জামান মিয়া সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে যুদ্ধ করেন ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাবসেক্টরে।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ

কুড়িগ্রাম জেলার উত্তরে ভূরুঙ্গামারী।ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। ভূরুঙ্গামারীর তিন দিকেই ভারত। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে ভূরুঙ্গামারীর পাকিস্তানিদের প্রতিরক্ষা অবস্থানে। এখানে নিয়োজিত ছিল পাকিস্তানিদের মিশ্র এক বাহিনী। নিয়মিত সেনা, ইপিসিএএফ (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স) ও স্থানীয় রাজাকার।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী প্রথমে আক্রমণ করে পাটেশ্বরীতে। মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে বিভক্ত ছিলেন। একটি দলের নেতৃত্ব দেন মো. বদরুজ্জামান মিয়া। তাঁরা একযোগে আক্রমণ চালিয়ে পাটেশ্বরী দখল করেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা সমবেত হন ভূরুঙ্গামারীর পূর্ব পাশে। সেখান থেকে তাঁরা গোলাগুলি শুরু করেন। পাকিস্তানিরাও তার পাল্টা জবাব দেয়।

পরদিন ১৩ নভেম্বর সকাল থেকে মিত্রবাহিনী কামানের সাহায্যে গোলাবর্ষণ শুরু করে। তাদের যুদ্ধবিমানও কয়েকবার ভূরুঙ্গামারীর আকাশে চক্কর দিয়ে গোলাবর্ষণ করে। এর ছত্রছায়ায় মো. বদরুজ্জামান মিয়া ও তাঁর সহযোদ্ধারা এগিয়ে যান পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা অবস্থানের সাত-আট শ গজের মধ্যে। পাকিস্তানিরা মরিয়া হয়ে তাঁদের আক্রমণ প্রতিরোধ শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁরা অবস্থান নেন পাকিস্তানি প্রতিরক্ষার চার-পাঁচ শ গজের মধ্যে।

মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ ছিল ত্রিমুখী। মো. বদরুজ্জামান মিয়ার দল এক দিক থেকে এবং অপর দুই দল অন্য দুই দিক থেকে আক্রমণ চালায়। এতে পাকিস্তানি সেনা, ইপিসিএফ ও রাজাকাররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। মধ্য রাত পর্যন্ত পাকিস্তানি অবস্থান থেকে থেমে থেমে গোলাগুলি অব্যাহত ছিল। এরপর গোলাগুলি কমে যেতে থাকে। সকাল হওয়ার আগেই তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

১৪ নভেম্বর খুব ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ভূরুঙ্গামারীতে ঢুকে পড়েন। সিও (সার্কেল অফিসার, এখন ইউএনও) অফিস ও হাইস্কুলের কাছে পৌঁছে তাঁরা দেখেন পাকিস্তানিরা পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেও গোলাগুলি করেনি। কারণ, ওদের অস্ত্রের গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে তারা আত্মসমর্পণ করে। সিও অফিসের কাছে ছড়িয়ে ছিল নিহত পাকিস্তানিদের মৃতদেহ। সব মিলে ৪০-৪৫ জন। এক বাংকারে পাওয়া যায় নিহত এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের মৃতদেহ।

মো. বদরুজ্জামান মিয়া ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। ১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল লালমনিরহাট হয়ে ধরলা নদী পেরিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী থানা (এখন উপজেলা) অভিমুখে আসে। তখন ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও স্থানীয় ছাত্র-যুবকদের সমন্বয়ে গড়া মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করেন। এই যুদ্ধে মো. বদরুজ্জামান মিয়া সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে যুদ্ধ করেন ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাবসেক্টরে।

মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য মো. বদরুজ্জামান মিয়াকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ সনদ নম্বর ৩৬০।

মো. বদরুজ্জামান মিয়া স্বাধীনতার পর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ২০০২ সালে অবসর নেন। তখন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের সচিব পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালের মে মাসে মারা গেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর বাবার নাম নজিরুজ্জামান মিয়া। মা রোকেয়া সানম। স্ত্রী বিউটি বেগম ও নূরমহল বেগম। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে।

২০০১ সালে ”মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি” শিরোনামে তাঁর রচিত একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

সূত্রঃ প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সফি খান,মিজানুর রহমান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৬।