Site icon হামার কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রামের আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাইজুল: ভাইরাল হওয়ার বিড়ম্বনায় হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা সেই সরলতা

​হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম

একটি সাধারণ জিলাপি বিক্রির ভিডিও দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়া কুড়িগ্রামের তাইজুল ইসলাম তাজু এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই খ্যাতি আশীর্বাদের চেয়ে যেন বিড়ম্বনাই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জীবনে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আর সংবাদকর্মীদের আনাগোনা, একের পর এক সাক্ষাৎকার আর নানা প্রতিশ্রুতির ভিড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দুর্গম চরাঞ্চলের এই সহজ-সরল মানুষটি।


​জনপ্রিয়তার আড়ালে ব্যক্তিগত সংকটে তাইজুল
​কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ঢাকডহর সরকার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী তাইজুল। পেশায় রাজমিস্ত্রীর হেলপার তাইজুলের কাঁধে রয়েছে অসুস্থ বাবা-মা এবং ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার ভার। অভাবের তাড়নায় স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একাকীত্ব কাটাতে আর মনের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও তৈরি শুরু করেন তিনি।
​ভাইরাল হওয়ার পর তাইজুলের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, “আমি ঠিকমতো খেতে পারছি না, বিশ্রাম নিতেও পারছি না। সারা দিন মিডিয়া আর কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সময় দিতে দিতে নিজের কোনো কাজই করতে পারছি না।”
​ভাইরাল হওয়ার সেই গল্প
​চলতি বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে জিলাপি বিক্রির ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া ফেলেন তিনি। তার পেজ ‘তাইজুল ইসলাম তাজু ২.০’-এর ফলোয়ার সংখ্যা কয়েকদিনের ব্যবধানে ৩১ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৮ লাখে দাঁড়িয়েছে। তার সরল বাচনভঙ্গি এবং সাহসী উপস্থাপনা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
​সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা
​তাইজুলের এই জনপ্রিয়তার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এগিয়ে আসা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বদরুজ্জামান রিশাদ তাকে খাস জমি বন্দোবস্ত ও ঘর নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন এবং নগদ ১০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও তাকে ঘর মেরামতের জন্য টিন ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
​হারিয়ে যাচ্ছে কি সেই ‘আসল’ তাইজুল?
​তবে তাইজুলের এই আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে চিন্তিত সুশীল সমাজ ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। সাংবাদিক হুমায়ুন কবির সূর্য, যিনি তাইজুলের প্রথম সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:
​”তাইজুল একজন সৎ ও নির্ভীক মানুষ ছিলেন। কিন্তু এখন যেভাবে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে এবং তাকে উপঢৌকনের নিচে চাপা দেয়া হচ্ছে, তাতে তার সেই চিরচেনা সরলতা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। মিডিয়ার অতি-আগ্রহে আমরা যেন সেই আদি ও অকৃত্রিম তাইজুলকে হারিয়ে না ফেলি।”
​তিন দিন আগের তালি দেওয়া পোশাকের সেই তাইজুল এখন দামি পোশাকে আবৃত। প্রতিদিন বাড়ছে তাকে নিয়ে ভিডিও তৈরির অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যে মানুষটি নিজের দুঃখ ভুলতে ভিডিও করতেন, এখন মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে তার সেই হাসিমাখা মুখটি ক্লান্তিতে ঢাকা পড়ছে। সচেতন মহলের দাবি, তাইজুলকে তার মতো থাকতে দিয়ে তার এলাকার উন্নয়নের দিকে নজর দেয়াই হবে প্রকৃত সহযোগিতা।

Exit mobile version