
সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (কুড়িকৃবি)-এর শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহঃ রাশেদুল ইসলাম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৬ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরবঙ্গের কৃষি শিক্ষার একটি আধুনিক মডেল হিসেবে গড়ে ওঠার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও স্বচ্ছতা, মেধা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে একাডেমিক ও প্রশাসনিক সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ড. রাশেদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার উদ্যোগ নেন। শুরু থেকেই নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দেশের অনেক নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মিত নিয়োগের প্রবণতা থাকলেও কুড়িকৃবি সেই ধারা থেকে সরে এসে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ বোর্ড, একাডেমিক কাউন্সিল, অর্থ কমিটি এবং সিন্ডিকেট গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সিন্ডিকেট সভা এবং ১২ এপ্রিল একাডেমিক কাউন্সিলের সভা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
উপাচার্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন, “নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের লবিং বা অসদুপায় সহ্য করা হবে না। প্রতিটি নিয়োগ লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হবে।”
বর্তমান প্রশাসনের দক্ষ নেতৃত্বে কুড়িকৃবি ইতোমধ্যেই কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় গত ৩ জানুয়ারি অংশগ্রহণকারীর হার ছিল ৯৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা দেশের ৯টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উচ্চ অংশগ্রহণ হার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থার প্রতিফলন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের (লেভেল-১, সেমিস্টার-১) চূড়ান্ত ফলাফল ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের মিড-টার্ম পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে তৃতীয় ব্যাচের ভর্তি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
অভিজ্ঞ খণ্ডকালীন ও অতিথি শিক্ষকদের মাধ্যমে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীরা সেশনজটমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার সুফল পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
কুড়িকৃবিতে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে (Outcome Based Education) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণা উন্নয়নে সাউথইস্ট ব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ অনুদান প্রদান করেছে।
সাম্প্রতিক সিন্ডিকেট সভায় কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে চারটি বিশেষায়িত গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—
• চর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট
• ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট
• ফ্রেশওয়াটার ফিসারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট
• ভেজিটেবলস অ্যান্ড ফ্রুটস রিসার্চ ইনস্টিটিউট
শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে অস্থায়ীভাবে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি হল চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও নেতৃত্বগুণ উন্নয়নে রোভার স্কাউট, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব এবং ডিবেটিং সোসাইটির মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অগ্রযাত্রা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, উপাচার্য ড. রাশেদুল ইসলামের নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিগগিরই একটি বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
পর্যাপ্ত সরকারি অনুদান ও নীতিগত সহায়তা পেলে এই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তরবঙ্গের কৃষি উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আপনার মতামত লিখুন :