উত্তরাঞ্চলে সাংবাদিকতা: চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন


Hamar Kurigram প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৭, ২০২৫, ৪:০৩ অপরাহ্ন /
উত্তরাঞ্চলে সাংবাদিকতা: চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন

হুমায়ুন কবির সূর্য, সিনিয়র সাংবাদিক, কুড়িগ্রাম

আপদকালিন কিংবা পরবর্তীতে দুর্যোগকালিন সময়ে সাংবাদিকতায় যে ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও সক্ষমতার বিষয়গুলি রয়েছে সে সম্পর্কে ইদানিং অনেক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে তাকে। এ সম্পর্কিত বেশকিছু গাইডলাইনও রয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে পিআইবিসহ বিভিন্ন মিডিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। কেবলমাত্র সংবাদ জগতে পা রেখেছেন কিংবা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করে আসলেও কোন প্রশিক্ষণ পাননি তাদের জন্য এই প্রশিক্ষণটির প্রয়োজন ও গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা দেখেছি এসব প্রশিক্ষণে কোস্টাল ও হাওর এলাকায় সংঘটিত সব ধরণের দুর্যোগের তথ্য-উপাত্ত প্রদান করা হয়ে থাকে, এছাড়াও অনেকেই ঘটনার সাক্ষি হিসেবেও প্রশিক্ষণে অনেক ইনফরমেশন শেয়ার করেন। কিন্তু চরাঞ্চলের বন্যা সম্পর্কিত কোন গাইডলাইন বা প্রাথমিক কোন তথ্য উপাত্ত কোন প্রশিক্ষণে পাওয়ার সুযোগ এখন পর্যন্ত হয়নি। বরং উত্তরাঞ্চলের বন্যা সম্পর্কে যেসব লেকচার দেয়া হয়ে থাকে তা সম্পূর্ণ পাঠককে তৃপ্ত করতে পারেনা। ফলে আলোচনাগুলো অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে। অথচ উত্তরাঞ্চলে নাম না জানা অনেক সংবাদকর্মী রয়েছেন যারা ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত চরাঞ্চলে বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলা করে আসছেন। লিখেছেন দুর্যোগ সম্পর্কিত একাধিক ফিচারধর্মী রিপোর্টও। তাদের লেখনীতে ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বিষয়ক অনেক ইনফরমেশন রয়েছে। যা সেফটি বিষয়ক প্রশিক্ষণে অনেক কাজে লাগতে পারে। কিন্তু এ ধরণের সাংবাদিকরা সবসময়ই থাকেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাদেরকে উদ্দীপ্ত করে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সহজে কাউকে পাওয়া যায় না। ফলে তাদের মেধার কোন বিকাশ ঘটে না। স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি অনেক সময় এ ধরণের সংবাদকর্মীদের তাদের ছোট খাটো প্রোগ্রামে কথা বলার সুযোগ করে দিলেও বড় ধরণের ফোরামে তাদের কথা বলার সুযোগ অনেক কম। একজন ফেসিলিটেটর অথবা প্রশিক্ষক হিসেবে তাদের কথা কেউ চিন্তা করেন না। ফলে বন্যাকালিন সময়ে দুর্গম চরাঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নবীন অনেক সাংবাদিক ভুগতে হয় নানান দুর্ভোগের মধ্যে। বিশেষ করে তথ্যের প্রয়োজনে অসময়ে চরাঞ্চলে গিয়ে রাত নেমে আসলে দুর্গম ব্রহ্মপূত্র নদে আটকা পরা সাংবাদিকদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। অনেকে রাস্তা হারিয়ে ফাঁকা চরে রাত্রি যাপন করতে বাধ্য হন। যেখানে নুন্যতম কোন সাপোর্ট থাকে না। এই গল্পগুলো অনেক সাংবাদিকের জীবনে ঘটেছে। যা সবসময় থেকেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। অনেক সাংবাদিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব না দেয়ায় তাকে সারাদিন অভুক্ত থেকে বাসায় ফিরতে হয়েছে অসুস্থ্য শরীরে। এমন অনেক সমস্যা রয়েছে যা এখানকার সাংবাদিকদের ফেস করতে হয়েছে বারংবার।

কুড়িগ্রামে বন্যাকালিন সময়ে এমন অনেক চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে যা প্রকাশ হওয়ার পর মানুষ এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে। আমরা এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে পারি যা সারাদেশেই চমক সৃষ্টি করেছিল।
ঘটনাটি বেশ কয়েক বছর আগে। কুড়িগ্রামের মান্যবর জেলা প্রশাসক এবং তৎকালিন সরকারের পদে আসীন গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ স্পিডবোটে বন্যা এলাকা পরিদর্শন করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ভারতীয় সীমানায় ঢুকে পরেন। সেখানে বিএসএফ সদস্যরা তাদেরকে চিনতে না পেরে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে পরিচয় পেয়ে তারাও খানিকটা অবাক হয়ে গিয়েছিল, পরে যথাযথ সম্মানের সাথে তাদেরকে বাংলাদেশের সীমানায় পৌঁছে দেয় তারা। সেই টিমে বিটিভির একজন ক্যামেরা পারসন এ ঘটনাটি ম্যাসেস আকারে অন্য সংবাদকর্মীদের সরবরাহ করার পর টিভিতে যখন টিকার আকারে বিষয়টি প্রকাশ যায়। তখন হৈ-চৈ পরে যায়। টিকারটি ছিল এরকম, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক বানভাসীদের খবর নিতে গিয়ে ভারতে আটক। এরকম অভিজ্ঞতা কমবেশি সব সাংবাদিকদের জীবনে একবার হলেও ঘটে গেছে। অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও নৌকার মাঝি বৃষ্টির মধ্যে পরে ভুল করে ভারতীয় সীমানায় ঢুকে গেছেন। তখন ভারতীয়রা সহযোগিতা করে বাংলাদেশী সীমানায় ফেরৎ পাঠিয়েছেন। জেলার ১৭৩ কিলোমিটার পযন্ত ভারতীয় সীমানা রয়েছে। যার অধিকাংশই রয়েছে নদীপথ। একই এলাকায় দু’দেশের বসতি থাকায় নতুন মানুষদের পক্ষে সীমানা মনে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে এ অঞ্চলের গণমাধ্যমকর্মীদের এ বিষয়ক সম্মক্ষ ধারণা প্রদানের জন্যও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন রয়েছে। যা পিআইবি প্রশিক্ষণগুলোতে অন্তর্ভূক্ত করা আবশ্যক।
পিছিয়ে পরা কুড়িগ্রাম জেলা সবসময় পত্রিকার পাতায় সংবাদ আকারে জায়গা করে নিলেও এর উত্তরণে কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেনি। জেলার ১৬টি নদ-নদী এবং ৪২০টির মত চরে প্রায় ৬/৭ লক্ষ মানুষের বসবাস। যাদের কেউ কেউ বিচ্ছিন্ন দুর্গম দ্বীপচরে অবস্থান করেন। এর তিনদিকেই রয়েছে ভারতীয় সীমানা। নদীপথে অনেক সময় ভারতীয়রাও ভুল করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এমন একটি পরিবেশে জীবন বাজি রেখে কাজ করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। বন্যায় ব্রহ্মপূত্রের উত্তাল ঢেউ দেখে অনেক সংবাদকর্মীকে দেখেছি আতংকে ভুগছেন। কিন্তু পেশাগত কারণে তারা ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন চরে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে রিপোর্টিংয়ে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এমনও কিছু চর রয়েছে যেখানে যেতে ৩/৪ঘন্টা সময় লাগে। ঢাকা থেকে যেসব রিপোর্টার আসেন তারা কাছাকাছি চরে গিয়ে ফিরে আসেন। ফলে এর দুর্গমতা সম্পর্কে তারা কোন ধারণাই পান না।
এমন এক পরিস্থিতিতে কাজ করে চলেছেন উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকরা। যারা সবসময় হয়ে থাকেন বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার। নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতা জায়গায় তাদের উত্তরণ হয়নি। কেউ সেই সুযোগও তাদেরকে করে দেয়নি। আমাদের এখানে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বন্যাকে ফোকাস করা অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক রয়েছেন যারা যে কোন প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতা বিনিময় করার যোগ্যতা রাখেন। তাদেরকে সেই সম্মান কখনো দেয়া হয়নি। অথচ তারা একটু চেষ্টা করলেই চরাঞ্চলে বন্যার সময় নিরাপত্তা, ঝুঁকি ও সক্ষমতা নিয়ে গাইডলাইন তৈরি করতে সহযোগিতা করতে পারেন। যা দিক নির্দেশনা হিসেবে সকল সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত কাজে লাগবে। এছাড়াও এ ধরণের প্রশিক্ষণে তাদেরকে ফেসিলিটেটর হিসেবেও মর্যাদা দেয়া যেতে পারে। বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।