নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram
কুড়িগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন যুব শক্তি এবং এনসিপির দুই নেতা পৃথকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের একজন কুড়িগ্রাম জেলা যুব শক্তির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফয়সাল সম্পদ এবং অপরজন এনসিপির ফুলবাড়ী উপজেলার কর্মী মো. সবুজ মিয়া। পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণের পাশাপাশি সাংগঠনিক নানা অসংগতি ও অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে ধরেছেন তারা। তবে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন, পদত্যাগের বিষয়ে এখনো সাংগঠনিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত ১৯ জুলাই ২০২৬ কুড়িগ্রাম জেলা যুব শক্তির সভাপতি বরাবর দেওয়া পদত্যাগপত্রে মো. ফয়সাল সম্পদ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অনিবার্য কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সময় দেওয়া এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণের কথা উল্লেখ করলেও পরে হামার কুড়িগ্রাম-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মো. ফয়সাল সম্পদ জানান, তার পদত্যাগের প্রকৃত কারণ ভিন্ন। তার ভাষ্য, সব বিষয় পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা সম্ভব হয় না।
তিনি অভিযোগ করেন, সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অসংগতি তৈরি হয়েছে এবং কয়েকজন ব্যক্তি সংগঠনকে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয়করণ করে রেখেছেন। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রত্যাশিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে না এবং অনেক ক্ষেত্রে নেতাকর্মীদের মতামত ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
তার দাবি, সংগঠনের নীতি ও আদর্শের বাইরে কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি তেলবাজি ও সুবিধাবাদী প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। এতে প্রকৃত নেতৃত্ব ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
মো. ফয়সাল সম্পদ আরও বলেন, সংগঠন নিয়ে যে প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই বর্তমানে সাংগঠনিক স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত অবস্থান শক্তিশালী করা এবং নিজস্ব বলয় তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর ফলে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার এই সিদ্ধান্তের জন্য কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। দেশের জন্য কাজ করার যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন, ভবিষ্যতেও সেই লক্ষ্য নিয়েই ব্যক্তি উদ্যোগে কাজ করে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা যুব শক্তির সেক্রেটারি তারিকুজ্জামান তমাল বলেন, “এগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। উনি নিজের আইডি থেকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে সাংগঠনিকভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”
অন্যদিকে, ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে এনসিপি ফুলবাড়ী উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর দেওয়া পদত্যাগপত্রে মো. সবুজ মিয়া দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের সব সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে বিষয়টি জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অনুলিপির মাধ্যমে অবহিত করা হয়।
পদত্যাগপত্রে সবুজ মিয়া উল্লেখ করেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এনসিপির মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের মনোনীত প্রার্থী ড. আতিক মুজাহিদের পক্ষে দিন-রাত পরিশ্রম করে জনসমর্থন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ের ত্যাগ ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান উপজেলা কমিটিতে এমন কিছু ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের দলের প্রতি পূর্বের কোনো অবদান বা ত্যাগ নেই। পাশাপাশি কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন সাংগঠনিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার দাবি, দলের নীতি ও আদর্শ উপেক্ষা করে স্থানীয়ভাবে নিষ্ক্রিয় ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের মতো কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হচ্ছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও পরিশ্রমের পর এমন অবমূল্যায়ন, অনিয়ম এবং আদর্শিক বিচ্যুতি তার রাজনৈতিক চেতনা ও বিবেককে গভীরভাবে আহত করেছে। তাই এমন পরিবেশে রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি স্বেচ্ছায় দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ বিষয়ে এনসিপি ফুলবাড়ী উপজেলা আহ্বায়ক নাজমুল ফেরদৌস (লাভলু) বলেন, “অনলাইনে পদত্যাগপত্র দেখেছি, তবে মূল কাগজ হাতে পাইনি।” পদত্যাগকারীর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে জেলা নেতৃবৃন্দ বলতে পারবেন।”
এদিকে, এনসিপি ও এর সহযোগী সংগঠন যুব শক্তির দুই নেতার পদত্যাগ এবং তাদের উত্থাপিত অভিযোগ কুড়িগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
