মোঃ মাইদুল ইসলাম ।। ভূরুঙ্গামারী
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা খাতুনকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের কাজে সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতনভুক্ত ব্যক্তিদের অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হলেও একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কীভাবে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ পেলেন, তা স্পষ্ট নয়।
ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের লক্ষ্যে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের আবেদন ও পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। এতে পাইকেরছড়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা খাতুনের নাম তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে রয়েছে।
তবে একজন জনপ্রতিনিধি একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বের সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের কাজ যুক্ত হলে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগে দলীয়করণ বা সুপারিশের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে অন্যান্য উপজেলায় মোবাইল নম্বরসহ নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ করা হলেও ভূরুঙ্গামারীতে মোবাইল নম্বর ছাড়া ফল প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
‘আবেদনে গৃহিণী লিখেছি’
রেহানা খাতুন বলেন, তিনি সমাজসেবা অফিসে একটি কাজে গেলে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের বিষয়টি জানতে পারেন। পরে একটি কম্পিউটার দোকান থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করে আবেদন করেন। সেখানে পেশা হিসেবে ‘গৃহিণী’ উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, পরীক্ষার মেসেজ পাওয়ার পর পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষায় চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে এবং তিনি সঠিক উত্তর দিয়েছেন। পরে তাকে নিয়ে লেখালেখি হয়েছে জানতে পেরে ১৪ আগস্ট ফলাফল দেখেন এবং সেখানে নিজের নাম দেখতে পান।
রেহানা খাতুন আরও বলেন, ইউপি সদস্য হিসেবে তিনি মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা সম্মানী পান। তার স্বামী আবু সাঈদ অসুস্থ হওয়ায় তার চিকিৎসার ব্যয়ও বহন করতে হয়।
সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, “একজন নাগরিক হিসেবে আমি সরকারকে সহযোগিতা করতেই পারি। তবে আইন অনুযায়ী যদি এটি সঠিক না হয়, তাহলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
‘আবেদনে ইউপি সদস্য উল্লেখ থাকলে বিষয়টি সহজ হতো’
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ শামছুজ্জামান বলেন, আবেদনে যদি রেহানা খাতুন ইউপি সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় উল্লেখ করতেন, তাহলে বিষয়টি সহজ হতো। এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা না করে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না।
‘নীতিমালার আওতায় না পড়লে ব্যবস্থা’
নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ বলেন, “যারা এ কার্যক্রমের আওতায় কাজ করতে পারবেন না, তিনি যদি নীতিমালায় উল্লেখিত সেই শ্রেণির মধ্যে পড়ে থাকেন, তাহলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিয়োগে দলীয় ব্যক্তি বা সুপারিশপ্রাপ্তদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও বলেন, সঠিকভাবে পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য উপজেলায় মোবাইল নম্বরসহ ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, “একেক জায়গায় একেক ফরম্যাটে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে মোবাইল নম্বর ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।”
নীতিমালায় কী আছে, প্রশ্ন সেখানেই
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব এবং তথ্য সংগ্রহকারীর ভূমিকা পৃথক রাখা হয়েছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রেহানা খাতুনের আবেদনপত্রে পেশা ‘গৃহিণী’ উল্লেখ করা এবং তিনি একই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি—এই দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
