ভূরুঙ্গামারী প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (গণিত) পদে নিয়োগ দেন প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন। অভিযোগকারীর দাবি, নিয়োগ কার্যক্রম ও বেতন করানোর কথা বলে তার কাছে ৪ লাখ টাকা দাবি করা হলে চাকরির আশায় সংসারিকভাবে অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে তিনি ওই টাকা পরিশোধ করেন।
পরে এমপিওভুক্তির জন্য বারবার আবেদন করলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ও শিক্ষক প্যাটার্ন জটিলতার কারণে তার ফাইল বাতিল হয়। এরপর প্রধান শিক্ষক তাকে ভৌত বিজ্ঞান বিষয়ে পুনরায় নিয়োগ দেন।
এমপিওভুক্তির আশায় তিনি দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিদ্যালয়ে পাঠদান করে আসছেন। সর্বশেষ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (গণিত) মো. আবুল হোসেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে অবসর গ্রহণ করলে পদটি শূন্য হয়। কিন্তু তাকে এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করার সুযোগ না দিয়ে গোপনে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষক চাহিদা পাঠানো হয়। ফলে দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষার পরও তিনি এমপিওভুক্তির আবেদন করার সুযোগ পাননি। নিয়োগের টাকা ফেরত চাইলে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন অজুহাত, ভিত্তিহীন মন্তব্য ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে কালক্ষেপণ করছেন। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা (বাংলা) সেলিনা খাতুন অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়ে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগসাজশ করে হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর দেখিয়ে বেতন উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক বিধিবহির্ভূতভাবে সেলিনা খাতুনের স্থলে নিপা পারভীন নামে একজনকে প্রক্সি শিক্ষক হিসেবে পাঠদানের অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বাংলা বিষয়ের পরিবর্তে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বাংলা বিষয়ের শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
অভিযোগকারীর আরও দাবি, বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় থেকে ব্যয় বেশি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছেন। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের কাছে কোনো অর্থ বা সুযোগ-সুবিধা দাবি করলে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শনসহ কারণ ছাড়াই শোকজ করেন। এতে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে এবং শিক্ষার পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
লিখিত অভিযোগের বাইরে রয়েছে একাধিক অভিযোগ যা স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ১৯৮৫ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক আব্দুল বাতেনকে ২০২২ সালের জনবল কাঠামোর নীতিমালায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দেখিয়ে অফিস সহায়ক পদে অন্য একজনকে প্রায় ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ।
এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক নিজের ছেলের বউকে ‘ACO’ পদে নিয়োগ দিয়ে অফিস সহকারীর দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তাকে দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করানোর এবং বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ইংরেজী সহকারী শিক্ষক রফিকুল নিয়মিত স্কুলে পাঠদান না করায় অন্যান্য শিক্ষকগণ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে নিয়মিত কমিটি না করে একক ক্ষমতাবলে তাকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করে এবং চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়। পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে আরও অভিযোগ করা হচ্ছে, বিদ্যালয়ের গাছ কাটার পাশাপাশি রাস্তার গাছ বিদ্যালয়ের গাছ হিসেবে দেখিয়ে কেটে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই প্রধান শিক্ষক তার ছেলের বউসহ পাঁচজনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি কামাত আঙ্গারীয়া দাখিল মাদ্রাসায় অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার পর এর দায় মাদ্রাসার সুপারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে উঠেছে।
তবে এসব বিষয় লিখিত অভিযোগে উল্লেখ নেই এবং এগুলোর স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও নিয়োগ সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে আরও একটি অভিযোগ রয়েছে—তিনি দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দাপট ব্যবহার করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ আড়াল করে রেখেছেন। তার প্রভাবের কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, “উক্ত শিক্ষকের নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। ওই টাকা নিয়োগ ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজে ব্যয় হয়েছে। প্রক্সি শিক্ষক ভালো ক্লাস নিচ্ছেন। সহকারী শিক্ষক সেলিনা খাতুন অসুস্থ। ইএফটির মাধ্যমে তার বেতন হয় বিধায় আমার কিছু করার নেই। বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও কোনো গড়মিল নেই।”
এ বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার অমৃত দেবনাথ বলেন, “এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

