নিজস্ব প্রতিবেদক | Hamar Kurigram
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি। চাকরিতে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগসহ তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় দপ্তর।
গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিনার স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে জুয়েলের বিরুদ্ধে সংগঠনের নীতিবিরোধী অবস্থান গ্রহণ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত কার্যকলাপে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে কেন পরবর্তী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে লিখিতভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও ব্যাখ্যা দিতে হবে। নোটিশ পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় দপ্তর বরাবর লিখিত জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শোকজের কারণ নিয়ে কেন্দ্রীয় দপ্তরের বক্তব্য
কী অভিযোগের ভিত্তিতে মাহমুদুল হাসান জুয়েলকে শোকজ করা হয়েছে, জানতে চাইলে এনসিপির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিনা বলেন, সাংগঠনিক অভিযোগের বিষয়গুলো বাইরে প্রকাশ করা যায় না। এ কারণেই কারণ দর্শানোর নোটিশে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডের উল্লেখ ছাড়া অন্য কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ লেখা সম্ভব হয় না।
চাকরিতে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ এবং টাকা ফেরত দেওয়ার ভিডিও ফুটেজ ও কল রেকর্ডের ভিত্তিতে তাঁকে শোকজ করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে সাদিয়া ফারজানা বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি বলতেছি, আমি আপনাকে এতটুকু বলতে পারি, উনার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগের মধ্যে এই অভিযোগও আছে।’
চাকরির প্রলোভনে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
উল্লেখ্য, এর আগে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে পুলিশে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এনসিপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করে বিশেষ কোটায় পুলিশে চাকরি নিশ্চিত করা এবং নিয়োগ পরীক্ষায় শতভাগ পাসের আশ্বাস দিয়ে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিন ধাপে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে দাবি পরিবারের।
ভুক্তভোগী নাঈম ইসলামের ভগ্নিপতি হাফিজুর মিয়ার দাবি, ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব খলিলুর রহমানের সঙ্গে চাকরির বিষয়ে তাঁর চুক্তি হয়। এ সময় কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল এবং নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি উঠে আসে। হাফিজুরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে তিন ধাপে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, টাকা দেওয়ার পর নাঈম ও হাফিজুরকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের একটি দালালচক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন হাফিজুর। পরে তাঁরা সেখান থেকে পালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। এ সময় নাঈমের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মূল সনদপত্র ঢাকায় থেকে যায়। নাঈমের দাবি, পরে মাহমুদুল হাসান জুয়েল ঢাকায় গিয়ে তাঁর সনদপত্র উদ্ধার করে দেন।
চাকরি না হওয়ায় পরিবারটি টাকা ফেরত চাইলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তবে নাঈমের দাবি, এখনো ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া টাকা পরিশোধের সময়সীমা নিয়েও ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
এ ঘটনায় নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন মধ্যস্থতার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, বিষয়টি মীমাংসার জন্য তিনি ২ লাখ টাকার একটি চেক দিয়েছেন। অন্যদিকে, মাহমুদুল হাসান জুয়েলও অর্থ লেনদেনের সময় উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অস্বীকারের বিষয়ও রয়েছে।
দুই নেতাকে বহিষ্কার, জুয়েলকে কেন্দ্রের শোকজ
ঘটনার পর কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপি খলিলুর রহমান ও আলমগীর হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করে। তবে জেলা আহ্বায়ক মুকুল হোসেন দাবি করেন, চাকরি-সংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কারণে নয়, বরং দলের অভ্যন্তরীণ অন্য কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ঘটনাটি নিয়ে বাংলা এডিশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কিছুদিন পর মাহমুদুল হাসান জুয়েলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি। এ বিষয়ে দলটির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিনা জানিয়েছেন, জুয়েলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে চাকরিতে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় দপ্তরের পাঠানো শোকজ নোটিশে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। সাংগঠনিক অভিযোগের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
