Site icon হামার কুড়িগ্রাম

কৃত্রিমতা সবখানে, মানুষ কোথায়?

সেঁজুতি মুমু, কুড়িগ্রাম

বর্তমানে AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বাংলায় যার প্রতিশব্দ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য গ্রহণ করছে। উন্নত দেশগুলোতে AI-এর ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে। উন্নয়নশীল দেশগুলোও AI ব্যবহারে পিছিয়ে নেই। তবে AI একই সাথে উন্নতি ও ঝুঁকি বয়ে এনেছে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাপক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ChatGPT, DeepSeek, OpenAI, Gemini ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য—বিশেষ করে ChatGPT। শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রশ্ন, নোটের সারাংশ, বইয়ের সারাংশ, গণিতের যেকোনো সমাধান AI অনায়াসে করে দিচ্ছে। Duolingo-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই একের অধিক ভাষা শিখতে এবং প্র্যাকটিস করতে সক্ষম হচ্ছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন বয়ে এনেছে। শিক্ষার্থীদের কষ্ট করে নোট বানাতে হচ্ছে না, এতে তাদের সময় বেঁচে যাচ্ছে। তারা সেই সময় অন্য কাজে বিনিয়োগ করতে পারছে।

ChatGPT-তে একটি বইয়ের ফাইল PDF আকারে আপলোড করলে অনায়াসে সেই বইয়ের সারাংশ পাওয়া যাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের শ্রম অনেক কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একই সাথে এটি ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিয়েছে। বইয়ের সারাংশ সহজে পাওয়া যায় বলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। এসাইনমেন্ট বা গবেষণার ক্ষেত্রে শ্রমের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে হুবহু নকল করছে, এতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানচর্চা না করে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

AI-এর ব্যবহারের ফলে সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে। ChatGPT-এর মতো অ্যাপগুলোতে যেকোনো বিষয়ে কবিতা বা গল্প লিখে চাইলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেকেন্ডে নতুন নতুন কবিতা লিখে দিচ্ছে। আর মানুষ এই সুযোগ গ্রহণ করে, যারা সাহিত্যের ‘স’ ও জানত না, তারাও কবি-সাহিত্যিক হয়ে যাচ্ছে! মানুষ পুরোপুরি AI-নির্ভর হয়ে পড়েছে। স্বনির্ভর জাতি মানুষ ক্রমে কৃত্রিমতা-নির্ভর হয়ে পড়ছে।

AI দিয়ে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও বানানো সম্ভব, যেগুলো উন্নয়নের কাজে অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। যেমন—স্থাপত্যশিল্পের নকশা বা নিজের ঘরটা পছন্দমতো সাজানোর জন্য আমরা AI-এর নির্দেশনা দিয়ে একটি আগাম ছবির মাধ্যমে ধারণা পেতে সক্ষম। কিন্তু মানুষ তা করছে না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এর অপব্যবহার করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজেদের বিকৃত ফ্যান্টাসির জগতকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। মেয়েদের স্বাভাবিক ছবি থেকে AI-এর মাধ্যমে নগ্ন ছবি ও ভিডিও বানাচ্ছে। এর ফলে অপরাধ জগতে নতুন অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নগ্ন ছবি এডিট করে ভিডিও বানিয়ে মেয়েদের ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পার্থক্য না বুঝে এগুলো নিয়ে মেয়েদের দোষারোপ করছে। ফলে মেয়েরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রযুক্তির এই জগত নতুন করে মেয়েদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।

AI-এর ফলে ব্যাপক হারে বেকারত্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে ভারোত্তোলনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য মানুষের শ্রম লাঘব করা। কিন্তু এতে ব্যাপক হারে মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যাচ্ছে।

ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং ইত্যাদির মাধ্যমে অনেক কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব কাজ মানুষের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অনেক সহজেই করা যাচ্ছে। ফলে এই দিক দিয়েও যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

তবে এটাও সত্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে অনেক নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে—যেমন AI ট্রেইনার, AI বিষয়ক আইন ও নৈতিকতা (Law and Ethics), সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি। কিন্তু এর জন্য দরকার, AI যেভাবে দ্রুত গতিতে আপডেট হচ্ছে, সেই গতিতে আমাদের সবাইকে AI বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, একসময় AI মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এ আশঙ্কা কোনো বাজে কল্পনা নয়। আমরা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে না নিই, তবে এই আশঙ্কাই সত্য হবে। এর থেকে বাঁচতে এখনই AI সম্পর্কে শিক্ষাদান করা অতীব জরুরি। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই AI সম্পর্কে পাঠদান করতে হবে। এজন্য AI নিয়ে নতুন বিষয় চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে AI বিষয়ক বিভাগ চালু করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক জটিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা স্নাতক পাস করেও অনেকেই কম্পিউটারে টাইপ করতে পারি না; সেখানে AI বিষয়ক জ্ঞান বিলাসিতা মাত্র। এ অবস্থা উত্তরণে আমাদের এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

 

•শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

Exit mobile version