
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তকে কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলে এর প্রকৃত গুরুত্ব আড়ালে থেকে যায়। বাস্তবে এটি উত্তরাঞ্চলের আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনৈতিক বিকাশের একটি মৌলিক ভিত্তি। একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র অবকাঠামোগত ভবন নয়; বরং এর সঙ্গে প্রয়োজন বিস্তৃত গবেষণা ক্ষেত্র, পরীক্ষামূলক কৃষিখামার, মৎস্য ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত ভূমি।
নদী, চরাঞ্চল এবং উর্বর পলি-মাটির অঞ্চলে এমন প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে বন্যা সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, চরভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং নদীনির্ভর অর্থনীতির ওপর বাস্তব গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্ধারণে সাময়িক সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা, গবেষণার সম্ভাবনা এবং সম্প্রসারণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য।
বর্তমানে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য তিনটি স্থান সবচেয়ে বেশি আলোচিত—দাসেরহাট ছড়া, ধরলা সেতুর উত্তর তীর এবং নালিয়ার দোলা। পরিদর্শনের পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রতিনিধি দল নালিয়ার দোলাকে তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী হিসেবে সুপারিশ করেছে।
প্রথমদিকে আলোচনায় থাকা দাসেরহাট ছড়া এলাকায় পরবর্তীতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত হয়। এটি নদীভিত্তিক গঠনের কারণে ভূমির স্থায়িত্ব অনিশ্চিত, রেলপথের খাস জমির জটিলতা রয়েছে এবং নদীভাঙনের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ধরলা সেতুর উত্তর তীর কুড়িগ্রাম শহরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এখানে জনবসতি ও অবকাঠামোর ঘনত্ব বেশি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃত গবেষণা ক্ষেত্র, খোলা কৃষিজমি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ এখানে সীমিত। এ কারণে এলাকাটি দীর্ঘমেয়াদে আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে নালিয়ার দোলা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে, কুড়িগ্রাম–চিলমারী মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই এলাকায় প্রায় ৪০০ একর উঁচু ও খালি জমি রয়েছে, যা কৃষি গবেষণা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
এখানে সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতে নৌযোগাযোগ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সুযোগ বিদ্যমান।
নালিয়ার দোলার অবস্থান উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে পারে। রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সহজগম্য হবে। চিলমারী–হারিপুর (মাওলানা ভাসানী) সেতুর মাধ্যমে গাইবান্ধা ও আশপাশের অঞ্চলের যোগাযোগ ইতোমধ্যে উন্নত হয়েছে।
ভবিষ্যতে চিলমারী–রৌমারী সেতু বাস্তবায়িত হলে কুড়িগ্রামের সঙ্গে জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। একই সঙ্গে রৌমারী ও রাজিবপুর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা অনেকাংশে দূর হবে। এটি উত্তরাঞ্চল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত করিডোর তৈরি করতে পারে।
নালিয়ার দোলার আশপাশের চরাঞ্চল, উর্বর পলি-মাটি এবং নদীনির্ভর পরিবেশ কৃষি গবেষণার জন্য একটি প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করতে পারে। এখানে বন্যা সহনশীল ফসল, চরভিত্তিক কৃষি, নদীভাঙন প্রতিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং নদীনির্ভর অর্থনীতি বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি যেহেতু মাঠভিত্তিক গবেষণা, তাই এই স্থানটি দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে সাধারণত একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে—আবাসন, ব্যবসা, পরিবহন, ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবাখাত সম্প্রসারিত হয়। অতীতে দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ই শহরের বাইরে স্থাপিত হয়ে পরবর্তীতে পুরো অঞ্চলের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সব দিক বিবেচনায় নালিয়ার দোলা কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত, বাস্তবসম্মত এবং ভবিষ্যৎমুখী স্থান হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি আবেগনির্ভর নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, গবেষণা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের বাস্তব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি সুসংহত মূল্যায়ন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ এবং সরকারি পর্যায়ের পর্যালোচনাতেও নালিয়ার দোলার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। তাই উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে হলে নালিয়ার দোলাকেই স্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে চূড়ান্ত করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হবে।
আপনার মতামত লিখুন :