আরিফুল ইসলাম রিগান
কুড়িগ্রামে সার নিতে গিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি যেন কমছেই না। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভিড়, সার না পাওয়া এবং বিতরণে বিশৃঙ্খলা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি গড়িয়েছে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও কৃষি কর্মকর্তাকে হয়রানির ঘটনায়।
সার বিতরণে অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলেও বিতরণ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষক, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেক এলাকায় তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুরে ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) সেখান থেকে সরে যান বলে জানা গেছে। পরে ক্ষুব্ধ কৃষকরা আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। প্রশাসন ও অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে কুড়িগ্রাম সদরের ঘোগাদহ ও ভোগডাঙা ইউনিয়নেও সার বিতরণকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা হয়। ঘোগাদহে সার বিতরণে বিলম্বের অভিযোগে অপেক্ষমাণ কৃষকদের হাতে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আহত হন।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নে ডিলারের গুদামে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে। পরে ইউএনও ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর চর রাজিবপুর উপজেলার রাজিবপুর বাজারে ডিলারের গুদাম ভাঙচুর করে সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে ক্ষুব্ধ কৃষকদের বিরুদ্ধে।
একই ধরনের উত্তেজনার ঘটনা এর আগে রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীতেও ঘটেছে।
‘তিন দিন ঘুরেও সার পাই নাই’
মঙ্গলবার উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর বাজারে ‘মেসার্স মো. আকবর আলী’ নামে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা সার নেওয়ার জন্য সেখানে ভিড় করেছেন।
সেখানে পাঁচজন কৃষককে এক বস্তা সার দেওয়ার পরও অনেক কৃষক সার না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
যমুনা এলাকার কৃষক রুহুল আমিন বলেন, “তিন দিন ঘুরি গেছি। আইজ সার নিবার আসছি। পাই নাই। এলা কবার লাগছে পাঁচ জন লাগবে। পাঁচ ভাইয়ের আইডি কার্ড আনছি। সেটা নাকি হবার নয়। পাঁচ জনকেই লাগবে। এলা ওমরা কি কামলা বাদ দিয়া ১০ সের সারের জন্য আসবে। এগলা তো মারি ফেলার বুদ্ধি করছে। এলা হামার আবাদও শ্যাষ, কামলাও শ্যাষ।”
একই ইউনিয়নের কৃষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য সোলজার বলেন, “আগে ডিলারের ঘর থেকে সার নিই নাই। এবার এই নিয়ম করে ভোগান্তি বাড়াইছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ে থাকা লাগে। এভাবে সার নেওয়া সম্ভব? মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। আগে খুচরা দোকানে সার দিতো। মানুষের যার যতটুকু দরকার সেখান থেকে নিত। এখনও সেটাই করা উচিত।”
ডিলারও চাইছেন ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণ
বিসিআইসি সার ডিলার রমজান আলী বলেন, “গত বছরও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণ হয়েছে। এবার শুধু ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণ হওয়ায় ইউনিয়নের কৃষকরা এক স্থানে জড়ো হচ্ছেন। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এমন হতো না।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক কৃষককে এক জায়গায় সার নিতে আসতে হওয়ায় ডিলার পয়েন্টে চাপ বাড়ছে এবং এতে স্বাভাবিকভাবেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
সার বিতরণে বিশৃঙ্খলা কমাতে সম্প্রতি কুড়িগ্রামে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে ডিলারের গুদামের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় কৃষকদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উলিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, “ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হলেও সেটা চালু হয়নি। শুধু ডিলার গুদাম থেকে সার দেওয়া হচ্ছে।”
‘সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করায় বিশৃঙ্খলা’
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, “সর্বসম্মতিক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেটা অনুসরণ না করায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এটা কার্যকর করছে না তা বুঝতে পারছি না।”
তিনি ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণে বারবার বলা হলেও তারা গড়িমসি করছে। জেলায় মাঠপর্যায়ে তাদের কাজের গাফিলতি ও অনাগ্রহ রয়েছে। সার বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এজন্য ডিডিকে বদলিও করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। পর্যায়ক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণ শুরু হচ্ছে।”
কৃষকদের দাবি, ভোগান্তি কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দিনমজুরি বা শ্রমের আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
কৃষকদের মতে, ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হলে একটি কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় কমবে এবং কৃষকেরা নিজেদের এলাকার কাছাকাছি থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার সংগ্রহ করতে পারবেন।
সার বিতরণে ধারাবাহিকভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখন কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন কৃষকেরা।






