আশির্বাদ রহমান
কৃষিনির্ভর জেলা কুড়িগ্রাম। জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শহর থেকে গ্রাম, এমনকি চরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত চাষাবাদে আমন মৌসুমে সারের চাহিদাও থাকে ব্যাপক।
তবে চলতি আমন মৌসুমে জেলার বিভিন্ন সার বিক্রয়কেন্দ্রে কৃষকদের দীর্ঘ সারি, ভিড় এবং কোথাও কোথাও নির্ধারিত সময়ের আগেই সার শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিলেও কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার চাহিদার তুলনায় সারের বরাদ্দ পর্যাপ্ত। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার উত্তোলন, মজুদের প্রবণতা ও সার সংকটের গুজবের কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ী, কুড়িগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আমন মৌসুমের আগস্টে জেলায় ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ২৫৩ মেট্রিক টন। চলতি বছর একই সময়ে তা বাড়িয়ে ৫ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন করা হয়েছে।
একইভাবে গত বছর আগস্টে ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। চলতি বছর তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫৭২ মেট্রিক টন। মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) গত বছর ছিল ১ হাজার ৫৭০ মেট্রিক টন, চলতি বছর তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৪৮ মেট্রিক টন। এছাড়া ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) গত বছর বরাদ্দ ছিল ৮০৯ মেট্রিক টন, চলতি আগস্টে তা বাড়িয়ে ৯২৪ মেট্রিক টন করা হয়েছে।
বরাদ্দের এই পরিসংখ্যানের পরও প্রশ্ন উঠেছে—পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পর সার নিয়ে এমন অস্থিরতা কেন?
ডিলার পয়েন্টে উপচে পড়া ভিড়
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মাঠ পর্যায়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজন অনুযায়ী সার নিতে গিয়ে অনেককেই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কৃষক নুরুজ্জামান বলেন, নিজের জমিতে যতটুকু সার প্রয়োজন, সাধারণত ততটুকুই তিনি ডিলারের কাছ থেকে নেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তার অভিযোগ, যাদের কৃষিজমি নেই, এমন ব্যক্তিদেরও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে সার নেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। আবার কোনো কোনো কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার সংগ্রহ করছেন। এতে ভবিষ্যতে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সার মজুদের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ও মোকলবাসা ইউনিয়নের কয়েকটি সার ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৯টায় বিক্রয়কেন্দ্র খোলার পর এক ঘণ্টার মধ্যেই সার শেষ হয়ে গেছে। এসব কেন্দ্রে কৃষকদের উপচে পড়া ভিড়ও দেখা যায়।
সার নিতে আসা কৃষক আশরাফ আলী বলেন, আমন মৌসুমের পাশাপাশি সামনে রবি মৌসুমের জন্যও অনেকে এখন থেকেই সার সংগ্রহ করছেন। আবার আমন মৌসুমে সার শেষ হয়ে যাবে এবং রবি মৌসুমে সার পাওয়া যাবে না—এমন কথাও ছড়িয়ে পড়ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
‘এখনই সার মজুদের প্রয়োজন নেই’
বেলগাছা ইউনিয়ন পরিষদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, প্রতি মাসের চাহিদা অনুযায়ী ওই মাসেই সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমন মৌসুমের পর রবি মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ীও সার বরাদ্দ দেওয়া হবে। তাই এখন অতিরিক্ত সার কিনে মজুদ করে রাখার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার উত্তোলনের কারণে ডিলার পয়েন্টে ভিড় বাড়ছে। প্রত্যেক কৃষক যদি নিজের জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সার নেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
কৃষি বিভাগের দাবি, সংকট নেই
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ী, কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত উপপরিচালক উদ্যান আবু মো. মনিরুজ্জামান বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত আবাদি জমির পরিমাণ ও সারের চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই চাহিদার ভিত্তিতেই বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে জেলায় সার সংকট হওয়ার কথা নয়।
তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কেন নেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি উদ্বেগের। কৃষকদের সার ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি নিয়েও উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মুখে মুখে সার সংকটের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে চাহিদা অনুযায়ী সার রয়েছে। তবে অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বেশি বরাদ্দ, তবুও বেশি ভিড়
কুড়িগ্রাম সার ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা বলেন, আগের বছর বরাদ্দ কম থাকার পরও ডিলার পয়েন্টগুলোতে এমন ভিড় দেখা যায়নি। চলতি বছর বরাদ্দ বেশি থাকার পরও প্রতিটি পয়েন্টে কৃষকদের ভিড় বাড়ছে এবং অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও বলেন, কোথাও কোথাও ডিলার পয়েন্টে ভাঙচুর ও সার লুটের ঘটনাও ঘটেছে।
গুজবেও বাড়ছে চাপ
সারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কুড়িগ্রামের যুবদল নেতা এটিএম নজিবর রহমান লেলিন বলেন, একটি মহল কৃষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সার সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে বলে তিনি মনে করেন। কৃষকদের গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সার নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাঠে প্রশাসন
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নাহিদা আফরীন বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে চাহিদা অনুযায়ী সার পাঠানো হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে আবাদি জমির পরিমাণ নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী ইউরিয়া, পটাশসহ অন্যান্য সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে।
তিনি বলেন, এরপরও কোনো কোনো কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ার চেষ্টা করছেন। রবি মৌসুমের জন্য এখনই সার মজুদের প্রয়োজন নেই। ওই মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী পরবর্তীতে সার বরাদ্দ দেওয়া হবে।
এদিকে সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতা নিরসনে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিজিবি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযান, মজুতকৃত সার উদ্ধার, ডিলার পর্যায়ে তদারকি এবং সমন্বিতভাবে সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
জেলা প্রশাসক অর্ণপূর্ণা দেবনাথ বলেন, কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কৃষকদের গুজবে কান না দিয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি। কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী নির্ধারিত নিয়মের বাইরে সার বিক্রি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অবৈধভাবে সার মজুদ করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কুড়িগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সারের বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। তারপরও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার উত্তোলন, মজুদের প্রবণতা, গুজব এবং ডিলার পয়েন্টে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকার পরও কেন কিছু বিক্রয়কেন্দ্রে অল্প সময়ের মধ্যেই সার শেষ হয়ে যাচ্ছে—এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর নিশ্চিত করতে ডিলার পর্যায়ের বিতরণ, কৃষকের প্রকৃত চাহিদা এবং সার উত্তোলনের হিসাব আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকৃত কৃষকের হাতে তার প্রয়োজন অনুযায়ী সার পৌঁছে দেওয়া এবং কৃত্রিম সংকটের যেকোনো সুযোগ বন্ধ করাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
