উন্নয়নের স্থিতিশীলতা ও কুড়িগ্রামের ভবিষ্যৎ: একটি ‘সেটেলড ইস্যু’র গুরুত্ব


Hamar Kurigram প্রকাশের সময় : মে ১২, ২০২৬, ৮:১৩ অপরাহ্ন /
উন্নয়নের স্থিতিশীলতা ও কুড়িগ্রামের ভবিষ্যৎ: একটি ‘সেটেলড ইস্যু’র গুরুত্ব

প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোসাইকোলজি গবেষক এলিজাবেথ ম্যাটির মতে, ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যখন অন্যের আবেগ ও প্রয়োজন নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন, তখন তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও প্রাজ্ঞ ও মানবিক হয়ে ওঠে। আমাদের বিশ্বাস, বর্তমান নীতিনির্ধারকগণও জনকল্যাণের মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করবেন।

একটি চলমান গাড়ি হঠাৎ ব্রেক করলে যেমন আরোহীরা তীব্র ঝাঁকুনির শিকার হন, কিংবা ভ্রূণাবস্থায় কোনো আঘাত যেমন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বিপন্ন করতে পারে—তেমনি চার বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত স্থান পরিবর্তনের চিন্তা এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এটি পিছিয়ে পড়া একটি জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার ওপরও বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে—জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠিত বা ‘সেটেলড ইস্যু’ অপরিকল্পিতভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা করলে তার ফল শুভ হয় না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নানা ঘটনাপ্রবাহে আমরা দেখেছি, যৌক্তিক ও মীমাংসিত বিষয়কে নতুন করে বিতর্কিত করার পরিণতি কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে। অহেতুক অস্থিরতা কেবল বিভেদ বাড়ায়; শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বলা হয়, তা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যদি দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হঠাৎ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়, তবে তার প্রভাব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাধারণ মানুষ যখন দেখবে চার বছরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও অনিশ্চিত, তখন অন্যান্য চলমান সরকারি প্রকল্পও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আজ যদি বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘নালিয়ার দোলা’ থেকে সরানোর নজির তৈরি হয়, তবে আগামীকাল অন্য কোনো গোষ্ঠী অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা অন্য কোনো মেগা প্রকল্প নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারে।

এর ফলে জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন বাস্তব অগ্রগতির বদলে কেবল ফাইল আর আলোচনার টেবিলেই আটকে থাকবে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প অন্য জেলায় স্থানান্তরের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ইমারতের একটি প্রধান ইট সরিয়ে নিলে যেমন পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পরিবর্তনও হবে তেমনি এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

বর্তমান জনবান্ধব সরকার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছে। উন্নয়ন রাজনীতির ভাষায় সিদ্ধান্তের ঘনঘন পরিবর্তনকে বলা হয় ‘পলিসি ইনকন্সিস্টেন্সি’, যা যেকোনো অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। পাশাপাশি ‘সানক কস্ট’ (Sunk Cost)—অর্থাৎ ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থ, শ্রম ও কারিগরি জরিপ—উপেক্ষা করাও কোনো বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। নালিয়ার দোলাকে কেন্দ্র করে যে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, তা বাতিল করা মানে উন্নয়নের ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমোরি’ মুছে ফেলার শামিল।

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: নালিয়ার দোলা কেন যৌক্তিক ও চূড়ান্ত পছন্দ?

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনের বিষয়টি এখন আর কোনো প্রস্তাবের পর্যায়ে নেই; বরং এটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা ও জনমতের ভিত্তিতে একটি ‘সেটেলড ইস্যু’তে পরিণত হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় কেন ‘নালিয়ার দোলা’ বারবার সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা ও প্রাথমিক নির্বাচন (২০২২)

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে জেলার বিভিন্ন স্থানের নাম প্রস্তাব করা হলেও জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও গোয়েন্দা সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে ২০২২ সালের ২২ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো: রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার সিদ্ধান্তের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সম্ভাব্য তিনটি স্থান সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করে।

পরবর্তীতে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকছুদুর রহমান ভূইয়া স্বাক্ষরিত পত্রে সড়ক, রেল ও নৌ-যোগাযোগের সমন্বয় এবং নির্ভেজাল খাস জমি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকায় ‘নালিয়ার দোলার’ ২৫০ একর জমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়।

ষড়যন্ত্র ও পুনঃতদন্তের অগ্নিপরীক্ষা

একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টাও দেখা গেছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার পক্ষ থেকে নালিয়ার দোলার পারিপার্শ্বিক জনপদ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ব্যয়বৃদ্ধির অজুহাত তুলে স্থানটি বাতিলের দাবি জানানো হয়।

এর প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি পুনরায় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু সত্য গোপন রাখা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরিফের নির্দেশনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) উত্তম কুমার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পুনরায় তদন্ত করে প্রমাণ করেন যে নালিয়ার দোলাই সবদিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। তাঁদের সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২১ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে জেলা প্রশাসন আবারও নালিয়ার দোলাকে বহাল রাখার সুপারিশ করে।

অর্থনৈতিক সাশ্রয় ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন

নালিয়ার দোলার যৌক্তিকতা কেবল ভৌগোলিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি স্থানীয় পত্রিকা ‘দৈনিক কুড়িগ্রাম খবর’ ও ‘দৈনিক সকালের কাগজ’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্যান্য স্থানের তুলনায় নালিয়ার দোলায় জমি অধিগ্রহণে প্রায় ৮২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং বালু ভরাটে বিপুল সরকারি অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের ক্যালেন্ডারেও নালিয়ার দোলাকেই স্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যা এই সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

সামষ্টিক ঐকমত্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট (২০২৪–২০২৬)

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানার সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় পুনরায় সর্বসম্মতিক্রমে নালিয়ার দোলার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।

এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নালিয়ার দোলার উপকণ্ঠেই ইরি ধান রোপণের ব্যবহারিক ক্লাস সম্পন্ন করেছে, যার প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক নথিতেও সংরক্ষিত রয়েছে।

একটি জেলার সুষম উন্নয়নের জন্য বহু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। তাই একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্থান নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে জেলার অন্যান্য উপযোগী স্থানে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই হবে অধিক কল্যাণকর। চলমান এই টানাপোড়েন উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কুড়িগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়; এটি লাখো অবহেলিত মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের প্রতীক। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই বাতিঘর রক্ষার প্রশ্নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, এই বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়—এটি আগামী প্রজন্মের সোনালি ভবিষ্যতের ঠিকানা।

আসুন, সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কুড়িগ্রামের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আমরা এক ও অবিভাজ্য থাকি।

লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ।